তারেক আবেদীন

অবশেষে বাতিল হলো ডেলটা লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানী লিমিটড এর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পদে শহিদুল ইসলামের নিয়োগ অনুমোদন।  বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ১৬ মে এ আবেদন নাকচ করে দিয়েছে।  আইডিআর’র পরিচালক (উপ সচিব) মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ডেলটা লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানী লিমিটড এর চেয়ারম্যানকে তা জানানো হয়েছে। বিষয়টি অর্থকাগজকে নিশ্চিত করেছেন প্রতিষ্ঠানে চলতি দায়িত্বে থাকা মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ারুল হক। চিঠিতে বলা হয়, ডেলটা লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানী লিমিটড এর প্রস্তাবিত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলামের দাখিলকৃত ব্যাচেলর অব আর্টস ও মাস্টার্স অব আর্টসের সনদপত্র ২টি দারুল ইনসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইস্যু করা হয়নি। এ বিষয়ে প্রাপ্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২টি সনদপত্র অনুমোদনে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর বিবেচনা করার কোন সুযোগ নেই।

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, এর আগে সানলাইফ ও বেস্ট লাইফে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পদে বীমা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলামের সনদপত্র যাচাইয়ের ক্ষেত্রে একই প্রতিবেদন পাওয়া যায়।

প্রস্তাবিত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) শিক্ষাগত যোগ্যতা, মোট কর্ম অভিজ্ঞতা, মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদ ৩ মাস শূন্য না রাখার নির্দেশ দিয়ে আগামী আড়াই মাসের মধ্যে এ পদে নতুন নিয়োগ প্রস্তাব পাঠানোর জন্য বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ থেকে কোম্পানিকে বলা হয়েছে।

১৯৯৩ সালে দেশের বৃহত্তম জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনার লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এ মাঠ পর্যায়ের বীমা কর্মী হিসেবে পেশায় নিযুক্ত বীমা নির্বাহী শহিদুল ইসলাম।  সন্ধানী, হোমল্যান্ড, সানফ্লাওয়ার, মার্কেন্টাইল ইসলামী, চার্টার্ড, সানলাইফ ও বেস্ট লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে দীর্ঘ সময় কাজ করলেও কোন বীমা কোম্পানিতেই পূর্ণাঙ্গ মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি তিনি। চার্টার্ড ও বেস্ট লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এ তিনি মুখ্য নির্বাহীর চলতি দায়িত্ব পালন করেছেন। 

শহিদুল ইসলাম বীমা খাতে আলোচনায় উঠে এসেছেন মূলত তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের কারণে। বীমা কোম্পানিতে মুখ্য নির্বাহী পদে চাকরি নিতে তিনি দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের অননুমোদিত ক্যাম্পাস মিরপুর-১০ থেকে ইস্যুকৃত বিএ ও এমএ পাসের দু’টি সনদ দাখিল করেন।

সনদ দু’টির তথ্য অনুসারে, তিনি ২০১০ সালে সিজিপিএ ৩.৫১ নিয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে ব্যাচেলর অব আর্টস (বিএ) এবং ২০১১ সালে সিজিপিএ ৩.৫৪ নিয়ে একই বিষয়ে মাস্টার্স অব আর্টস (এমএ) ডিগ্রি অর্জন করেছেন।  

তবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের ধানমন্ডি ক্যাম্পাস থেকে ইস্যুকৃত এ সম্পর্কিত বিভিন্ন চিঠিতে দেখা গেছে শহিদুল ইসলামের বিএ এবং এমএ সনদের কোন বৈধতা নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বলছে- দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের মিরপুর ক্যাম্পাসের কোন বৈধতা নেই।  আবার সাময়িক অনুমোদন পাওয়া দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র বৈধ ক্যাম্পাস ধানমন্ডি থেকেও বলা হয়েছে- শহিদুল ইসলামের সনদ দু’টি ধানমন্ডি ক্যাম্পাস থেকে ইস্যু করা হয়নি।

শহিদুল ইসলামের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ যাচাইয়ের জন্য ২০২০ সালের ২৭ আগস্ট দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়কে চিঠি দেয় সানলাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানী লিমিটেড। সে সময় শহিদুল ইসলাম বীমা কোম্পানিটিতে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব পালন করছিলেন। সানলাইফের ওই চিঠির ৪দিন পর ৩১ আগস্ট জবাব দেয় বিশ্ববিদ্যালয়টির কর্তৃপক্ষ। দারুল ইহসান ট্রাস্টের প্যাডে সনদ দু’টির বিষয়ে পাঠানো মতামতটি ছিল- সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর উল্লেখিত প্রোগ্রামের সনদপত্র দু’টি দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ী নং ২১, রোড-৯/এ, ধানমন্ডি আ/এ, ঢাকা-১২০৯ থেকে ইস্যু করা হয়নি।

দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমন মতামত আসার কিছুদিন পরেই সানলাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানির চাকরি ছেড়ে বেস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্সে যোগদান করেন শহিদুল ইসলাম। সেখানেও তিনি মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব পালন করেন। 

শহিদুল ইসলাম কোম্পানিটিতে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব পালনকালে ২০২১ সালের ১৮ আগস্ট বেস্ট লাইফ কর্তৃপক্ষ দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের মিরপুর ক্যাম্পাসের বৈধতা জানতে চেয়ে ইউজিসিকে চিঠি দেয়।  তার প্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি ইউজিসি থেকেও তার সম্পর্কে একই তথ্য দেয়া হয়।

দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৯৯৩ সালের ২৯ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এর অনুমোদন না থাকায় পরে বন্ধ হয়ে যায়।  বন্ধকৃত দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়টির সাময়িক অনুমতি পত্রে উল্লিখিত ঠিকানা ছিল বাড়ী নং-২১ (নতুন), রোড নং- ৯/এ, ধানমন্ডি আ/এ, ঢাকা- ১২০৯।  এ ঠিকানার বাইরে কমিশন অনুমোদিত আর কোন বৈধ ক্যাম্পাস ছিল না।

ডেলটা লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর পরিচালনা পর্ষদের ২৫৫তম সভায় শহিদুল ইসলামকে কোম্পানিটির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। গত ২ এপ্রিল এই নিয়োগ অনুমোদনের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থায় আবেদন জানান কোম্পানিটির চেয়ারম্যান হাফিজ আহমেদ মজুমদার। জানা গেছে, এ পদে শহিদুল ইসলামের নিয়োগ অনুমোদন পেতে সরকারের একজন মন্ত্রীর সুপারিশ নেয়া হয়।

বীমা নির্বাহী মো. শহিদুল ইসলামের সঙ্গে অর্থকাগজ থেকে যোগাযোগ করা হয়।  তিনি জানান, ডেলটা লাইফে মুখ্য নির্বাহী পদে তার নিয়োগ প্রস্তাব নাকচ করে দেয়া হয়েছে সে সম্পর্কে তিনি অবহিত নন। তিনি অর্থকাগজকে বলেন বিষয়টি নাকচ হলে তিনি পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করবেন। দাখিলকৃত তার সনদ ২টি বৈধ উল্লেখ করে শহিদুল ইসলাম জানান, ২০১৮ সাল অবধি বিশ্ববিদ্যালয়টির কাজকর্ম প্রশাসনিকভাবে বৈধ ছিল, তাই সনদ অবৈধ হতে পারে না।

বিষয়টি যেহেতু অনেকদিনের সমস্যা এবং সনদপত্র বৈধ হলে তিনি এতদিন আইনগত ব্যবস্থা কেন গ্রহণ করেননি সে ব্যাপারে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে মহামান্য আদালতের রায় ছিল তাই ব্যবস্থা নেইনি। এখন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন কিনা প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন একটাতো বিহিত করতেই হবে।

অকা/বীখা/ সন্ধ্যা, ২১ মে, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 3 years আগে

Leave A Reply

Exit mobile version