গোলাম মোস্তফা ●
বৃক্ষের পরিচয় পাওয়া যায় তার ফলে। আর মানুষের দেশ প্রেমের পরিচয় পাওয়া যায় তার কর্মে। জন্মভূমির প্রতি, স্বজাতির প্রতি, মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা ও গভীর শ্রদ্ধাবোধের নামই দেশপ্রেম। দেশপ্রেম না থাকলে দেশ ও জাতির উন্নতির আশা করা যায় না। সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়তে হলে তাই প্রতিটি নাগরিককে অবশ্যই দেশ প্রেমিক হতে হয়। বিশ্বের উন্নত জাতিগুলো দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেই তারা আজ উন্নতির স্বর্ণশিখরে আরোহণ করতে পেরেছে।
মা যেমন প্রতিটি সন্তানের কাছে প্রিয়, ঠিক তেমনি প্রতিটি মানুষের কাছে তার জন্মভূমি অধিক প্রিয়। প্রিয় জননীর সঙ্গে সন্তানরা যেমন সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে না, তেমনি প্রিয় মাতৃভূমির সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন করা যায় না। তাই দেশপ্রেম বলতে শুধু দেশের মাটির প্রতি ভালোবাসাকে বোঝায় না। নিজ দেশের আলো-বাতাস, ফলফুল, মাটি পানি, প্রকৃতি-পরিবেশ, শিক্ষা-সংস্কৃতি, জাতি ও ভাষার প্রতি গভীর অনুরাগ, নিবিড় ভালোবাসা ও যথার্থ আনুগত্যকেই দেশপ্রেম হিসেবে গণ্য করা হয়। যে মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম নেই, সে মানুুষ হলেও প্রকৃত মানুষ নয়।
দেশপ্রেমের বোধটি সব মানুষের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হলেও আমাদের দেশের মানুষের জন্য আজ তা সঠিক বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের মাঝে এখন যে ধরনের দেশপ্রেমের নমুনা পরিলক্ষিত হচ্ছে তাতে আমাদের হতাশই হতে হচ্ছে; বিশেষ করে সমাজের উপরতলার মানুষের কাজকর্ম দেখে এই হতাশা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজে এদের শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতে দেখা যাচ্ছে। দেশের অবহেলিত- নিঃগৃহীত, নিরন্ন মানুষকে নিয়ে চিন্তা করার মানসিকতা তাদের মাঝে আর তেমন দেখা যাচ্ছে না। সবাইকে এখন নিজের আখের গোছাতেই ব্যস্ত দেখা যায়।
এ অঞ্চলে দেশপ্রেমের স্বর্ণস্বাক্ষর রেখে গেছেন তিতুমীর, শেরেবাংলা ফজলুল হক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানীসহ ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতাযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী লাখো বীরসেনানী। আমাদের দেশের ইতিহাস দেশপ্রেমের গর্বে গর্বিত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ছয় দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান আমাদের অনন্য দেশপ্রেমের প্রমাণ।
বর্তমানে দেশে রাজনীতি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের নামে চলছে হরিলুট। কে কাকে কীভাবে ল্যাং মেরে কীভাবে ঠকিয়ে, ব্যাংকের অর্থ লুটপাট করে এবং আমদানি-রফতানির মাধ্যমে কাড়ি কাড়ি টাকা বিদেশে পাচার করবে-- দেশে চলছে এখন এসবেরই মহোৎসব। সর্বত্র শুধু খাই খাই রব। ব্যবসার নামে ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করে ফেরার হচ্ছে এসব লোকের অনেকেই। দ্বিধাহীন চিত্তে বিভিন্ন দেশে পাচার করছে এসব টাকা।
সন্দেহ নেই আওয়ামী লীগ দেশপ্রেমের দাবিদার একটি রাজনৈতিক দল। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক কার্যাবলি দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন, এখন এ দেশের রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। বাংলাদেশের রাজনীতি এখন একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন ব্যবসায়ী ও টাকাওয়ালারা। রাজনীতিবিদরা টাকাওয়ালাদের কাছে কোণঠাসা, এক প্রকার জিম্মি। এই ব্যবসায়ী ও টাকাওয়ালাদের দোর্দ- প্রতাপে এ দেশের রাজনীতি সাধারণ মানুষের তেমন উপকারে আসছে না। লাখো কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেও মানুষের কোনো সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। মানুষের সামনে শুধু সমস্যার পাহাড় আর পাহাড়। সমাজের উপরতলার লোকদের দেশপ্রেম ঠুনকো বলেই আমাদের আজ এসব চোখ বুজে দেখে যেতে হচ্ছে।
তাদের দেশপ্রেম ঠুনকো না হলে কীভাবে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা পাচারের মহোৎসব চলে? যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৬ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৪ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বিপুল এই অর্থ পাচার হয়েছে আমদানি-রপ্তানিতে পণ্যের মূল্য ঘোষণায় ফাঁকি দিয়ে। (যুগান্তর, ১৮-১২-২০২১)। কিছুদিন আগে আরেকটি জাতীয় পত্রিকায় দেখা যায়, গত ১৬ বছরে দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা। (কালের কণ্ঠ, ০৬-০৭-২০২১)। এসব কি সমাজের উপরতলার লোকদের দেশপ্রেমের ঠুনকো নজির নয়? যে চেতনা নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, তার ছিটেফোঁটা এসব লোকের মধ্যে থাকলে এ কাজ তারা কখনও করতে পারেন?
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এ সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশ করলে জাতীয় সংসদে এবং পত্রিকার পাতায় তখন একটু সরগরম হতে দেখা যায়। দেখা যায় একে অন্যকে দোষারোপ করতে। কিছুদিনের মধ্যেই আবার যে ‘লাউ সেই কদু’-- সব স্তিমিত হয়ে যায়। নীরবে চলতে থাকে ব্যবসা-বাণিজ্যের নামে আবার অবাধ অর্থপাচার। গত ১৬ বছরে যে পরিমাণ অর্থপাচারের কথা শোনা যাচ্ছে, তা সর্বশেষ দুই অর্থবছরের মোট বাজেটের কাছাকাছি বলে প্রতীয়মান।
অর্থ পাচারের ইস্যুটি যখন সামনে আসে, তখন চুনোপুঁটি কাউকে কাউকে ধরা হয়। কিন্তু রাঘববোয়ালরা নিরাপদেই থেকে যায়। নরোম বিছানায় নাক তারা ডাকিয়ে ঘুমায়। এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, অবৈধভাবে অর্থপাচার দেশের অর্থনীতির ক্ষতির পাশাপাশি দেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করছে।
পাচার করা অর্থের বেশির ভাগ অর্থাৎ ৮০ শতাংশেরও বেশি বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে পাচার করা হয়। আমদানিযোগ্য পণ্য বা সেবার মূল্য বৃদ্ধি করে বিশেষ করে যেসব পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক কম সেসব পণ্য বা সেবা আমদানির মাধ্যমে অর্থপাচার হয়ে থাকে। অপরদিকে রফতানি করা পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে অবশিষ্ট অর্থ বিদেশে রেখেও অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটছে অহরহ। অর্থপাচারের অন্য আরেকটি পদ্ধতি হলো হুন্ডি। হুন্ডিওয়ালাদের মাধ্যমে অনায়াসেই বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার হচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার হওয়ার প্রধান প্রধান কারণ বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এখানে বিনিয়োগের কোনো নিরাপত্তা নেই। একজন ব্যবসায়ী তার অর্থ এ দেশে বিনিয়োগ করে নিশ্চিত থাকতে পারেন না। বিভিন্নভাবে সরকারি-বেসরকারি হুমকির মুখে তাদের বিনিয়োগ পাহারা দিয়ে রাখতে হয়। একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে গেলে একজন উদ্যোক্তাকে হাজারো রকমের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করা অনেক বেশি জটিল ও ব্যয়সাধ্য ব্যাপার।
ব্যবসায়ীদের টাকা বাংলাদেশে স্বচ্ছন্দে বিনিয়োগ করতে পারলে হয়তো অনেকেই অর্থপাচারের চিন্তা করতেন না। এক্ষেত্রে ব্যবসা এবং ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তাদান, চাঁদাবাজি বন্ধ ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্নমুখী চাপ থেকে ব্যবসায়ীদের মুক্ত রাখতে হবে। সর্বোপরি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সরকারি অফিসগুলোকে হতে হবে ব্যবসা সহায়ক। এসব সুচারুরূপে হলেই আশা করা যায়-- বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার বন্ধ হবে এবং বাংলাদেশে বিদেশি পুঁজি আসবে। সৎ ব্যবসায়ী ও অন্য পেশার নাগরিকরা যাতে তাদের অবস্থান এবং চলাফেরা নিরাপদ ভাবতে পারেন সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
স্বাধীনতার সময় ন্যায়নীতিভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের যে অঙ্গীকার ছিল, তা আজ পর্যন্ত রক্ষা করা হয়নি; বরং সমাজে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে প্রচ- বৈষম্য বেড়েছে। এত বছরেও আমরা দেশ শাসনের একটা টেকসই বন্দোবস্ত গড়ে তুলতে পারিনি, যেখানে শাসনব্যবস্থার সর্বস্তরে জবাবদিহিতা থাকবে। গণতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী যে কোনো শাসনব্যবস্থাতেই জবাবদিহি ছাড়া কোনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না।
নিখাদ দেশপ্রেম, দূরদর্শিতা, দৃঢ় মানসিকতা ও মানবিক গুণাবলি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসীন করেছে বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে। আজ তিনি বাঙালির জাতীয় ঐক্যের প্রতীক এবং বাঙালি জাতির সব আশা-ভরসার নিরাপদ আশ্রয়স্থল। মোটা দাগে ’৭৫-পরবর্তী বাঙালি জাতির যা কিছু মহৎ অর্জন, তা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই অর্জিত। দেশপ্রেম, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করলে দেশের উন্নয়ন সম্ভব বলে তিনিও বারবার সে আহ্বানই জানিয়েছেন। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছেন, দেশের উন্নয়ন করতে হলে সবাইকে নিষ্ঠাবান হতে হবে; সবার মধ্যে দেশপ্রেম থাকতে হবে। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে, সততা নিয়ে কাজ করলে বাংলাদেশের উন্নতি করা কোনো ব্যাপার নয়। অর্থ পাচার ঠেকাতে দেশের হাইকোর্টও বেশ সোচ্চার বলে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আদশে-নির্দেশ জারি করে চলেছে।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ‘সোানার বাংলা’ আর জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন ‘২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্র’ বাস্তবায়নে সব বাধা দূর করতে হবে। দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাপূর্বক অবৈধ পন্থায় বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরানোরও উদ্যোগ নিতে হবে। রাজনীতির মাঠেও ভালো নেতাকর্মীর পুনর্বাসন করতে হবে। সবাইকেই মনে রাখতে হবে, এর বিকল্প মানেই বিচ্যুতি। আর কোনোরূপ বিচ্যুতিই আমাদের এখন কাম্য নয়। অনেক সময় হেলায় হেলায় হারিয়ে গেছে।
#
লেখক সাংবাদিক
ornabmostafa1968@gmail.com
সর্বশেষ হালনাগাদ 4 years আগে

