অর্থকাগজ প্রতিবেদন>

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা-২০২৬–এর খসড়া প্রণয়ন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। নীতিমালাটি কার্যকর হলে দেশের ডিজিটাল বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রস্তাবিত নীতিমালা অনুযায়ী, বিশ্বের যেকোনো দেশের ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে অনলাইনে পণ্য ও সেবা কিনতে পারবেন। একইভাবে বাংলাদেশের ভোক্তারাও বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে আরও সহজ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পণ্য আমদানি করতে পারবেন।

খসড়া নীতিমালায় মেধাস্বত্ব সুরক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে কপিরাইট, ট্রেডমার্ক, পেটেন্টসহ বিদ্যমান সব মেধাস্বত্ব আইন কার্যকর থাকবে। ফলে নকল ব্র্যান্ডের পণ্য, পাইরেটেড সফটওয়্যার, কপিরাইট লঙ্ঘনকারী পণ্য কিংবা মিথ্যা তথ্য দিয়ে কোনো উদ্যোক্তা পণ্য বিক্রি করতে পারবেন না।

এ ছাড়া প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন, অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ক্যাসিনো, বেটিং, লটারি, গেমিং টোকেনের লেনদেন বা পরিচালনাও নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। যেসব পণ্যের আমদানি বা রপ্তানি আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ, সেগুলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও বিক্রি করা যাবে না। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া কোনো ধরনের গিফট কার্ড বা বিকল্প ডিজিটাল অর্থপ্রদানের মাধ্যম চালু করা যাবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নীতিমালা দেশের ডিজিটাল বাণিজ্যকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে।

সাবেক অর্থ ও বাণিজ্য সচিব (সিনিয়র) মাহবুব আহমেদ বলেন, সময়ের চাহিদা বিবেচনায় এ ধরনের আইন প্রণয়ন যথাযথ উদ্যোগ। তবে ডিজিটাল বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচারের সুযোগ যেন তৈরি না হয়, সেদিকে কঠোর নজর রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দেশে ব্যবসার সুযোগ তৈরির প্রস্তুতির অংশ হিসেবেও এই নীতিমালা বিবেচিত হতে পারে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও), জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা (আঙ্কটাড) এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি)-এর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সীমান্ত অতিক্রম করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক পণ্য ও সেবা বাণিজ্য বিশ্বজুড়ে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।

বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজারের আকার বর্তমানে প্রায় ৬০০ থেকে ৭৪০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। দ্রুত সম্প্রসারণশীল এ খাত এতদিন বিচ্ছিন্ন আইন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা, কাস্টমস বিধি এবং ই-কমার্স নির্দেশিকার সমন্বয়ে পরিচালিত হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক লেনদেন, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, কর আদায়, ভোক্তা সুরক্ষা এবং বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে নীতিগত ঘাটতি ছিল।

নতুন খসড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকেও বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় আনা। এতদিন বিদেশি অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলো বাংলাদেশি গ্রাহকদের কাছে পণ্য বিক্রি করলেও তাদের জন্য আলাদা কোনো নিবন্ধন বা জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা ছিল না।

প্রস্তাবিত নীতিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করতে হলে বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকেও ডিজিটাল বিজনেস আইডি (ডিবিআইডি) গ্রহণ করতে হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের নিবন্ধন ও তদারকির আওতায় আসবে। এতে কর আদায়, ভোক্তা অভিযোগ নিষ্পত্তি, তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ আরও কার্যকর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বশেষ হালনাগাদ 2 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version