অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম মিউচুয়াল ফান্ড। বৈশ্বিকভাবে পুঁজিবাজারে বিভিন্ন ধরনের মিউচুয়াল ফান্ডের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এসব ফান্ডের অধীনে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ থাকে, যা পুঁজিবাজারসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করেন সম্পদ ব্যবস্থাপকরা। পুঁজিবাজারের সংকটকালে বাজার স্থিতিশীলতায়ও ফান্ডগুলো ভূমিকা রেখে থাকে। যদিও বৈশ্বিক এ চিত্রের বিপরীত অবস্থা বাংলাদেশে। আকারে ছোট হওয়ায় দেশের পুঁজিবাজারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেই মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর। এমনকি বাজারের সংকটকালেও ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে এসব ফান্ড।
বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের (বিসিজি) প্রকাশিত ২০২১ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা খাতের অধীনে থাকা সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০৩ ট্রিলিয়ন ডলার। এর ৪১ শতাংশ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আর ৫৯ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের। বিপুল পরিমাণ এ সম্পদের বড় অংশই উত্তর আমেরিকা অঞ্চলের দেশগুলোর। এ অঞ্চলের সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ৪৯ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ রয়েছে। এছাড়া ইউরোপ, এশিয়া-প্যাসিফিক এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের দেশগুলোর সম্পদ ব্যবস্থাপকদের কাছেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সম্পদ রয়েছে।
জিডিপির অনুপাতে সম্পদ ব্যবস্থাপকদের অধীনে থাকা সম্পদের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রে ১৩২ শতাংশ। কানাডায় এর পরিমাণ ১০৮ শতাংশ। এছাড়া নেদারল্যান্ডসে ১০৬, সুইজারল্যান্ডে ৯৬, সুইডেনে ৮৯, ফ্রান্সে ৮১, যুক্তরাজ্যে ৭০ ও জার্মানিতে ৬৮ শতাংশ। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়ার জিডিপির অনুপাতে সম্পদ ব্যবস্থাপকদের আওতাধীন সম্পদের পরিমাণ ৫৪ শতাংশ। এছাড়া জাপানে ৪০ দশমিক ৬, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৩৪ দশমিক ৬, ভারতে ১৪ দশমিক ২, চীনে ১৩ দশমিক ২, পাকিস্তানে ১ দশমিক ৫, শ্রীলংকায় ১ দশমিক ৩ শতাংশ। বাংলাদেশে এর পরিমাণ ১ শতাংশেরও কম।
রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) ২০২১ সালের আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের পুঁজিবাজারের মোট লেনদেনের ৮০-৮২ শতাংশই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দখলে রয়েছে ১৫-২০ শতাংশ। আর বিদেশীরা ৩ শতাংশের মতো লেনদেন করে থাকেন। দেশের পুঁজিবাজারের মোট বাজার মূলধনে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অবদান ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ। ব্যক্তিশ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ ও মিউচুয়াল ফান্ড ১ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। দেশের পুঁজিবাজারে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর এ অবস্থানের কারণে বাজারে এ খাতের উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা নেই বললেই চলে। ফলে সংকটকালে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের মিউচুয়াল ফান্ড পুঁজিবাজারে ভূমিকা রাখতে পারছে না।
এ বিষয়ে বিএসইসি কমিশনার অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের পুঁজিবাজারেও প্রভাব ফেলেছে। পুঁজিবাজারের সংকটকালে শুধু মিউচুয়াল ফান্ড নয় ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সব প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীই ভূমিকা রাখবে এটা প্রত্যাশিত। অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের দেশে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের আকার বেশ ছোট। ফলে খাতটি এখনো পুঁজিবাজারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখতে পারছে না। তাছাড়া মিউচুয়াল ফান্ডগুলো এরই মধ্যে তাদের সম্পদের ৯০ শতাংশ বিভিন্ন তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করেছে। ফলে চাইলেই নতুন করে বিনিয়োগ করার মতো সক্ষমতা নেই ফান্ডগুলোর। দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে গতিশীল করে তুলতে আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই বিভিন্ন ধরনের আইনি ও কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছি। পর্যাপ্ত ডিসক্লোজার প্রকাশ করা, সুশাসন নিশ্চিত করা, সম্পদের মান বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বেমেয়াদি ফান্ডগুলোর পুনঃক্রয়কৃত ইউনিটের মূল্য ও বাজারমূল্যে এনএভির মধ্যে ব্যবধান অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। গত বছর ফান্ডগুলো ভালো পরিমাণে লভ্যাংশ দিয়েছে। আশা করছি সময়ের ব্যবধানে দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাত আরো গতিশীল হয়ে উঠবে।
দেশে ১৯৮০ সালে আইসিবির হাত ধরে প্রথম মিউচুয়াল ফান্ডের যাত্রা হয়। এর ২০ বছর পর ২০০০ সালে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান অ্যাসেট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসেস (এইমস) অব বাংলাদেশ লিমিটেডের মাধ্যমে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত মিউচুয়াল ফান্ডের যাত্রা হয়। দেশে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের পথচলা ৪০ বছরের বেশি হলেও বিভিন্ন কারণে খাতটি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ডের অর্থ বিভিন্ন তালিকাবহির্ভূত কোম্পানিতে বিনিয়োগের বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এ ধরনের বেশকিছু বিনিয়োগের বিপরীতে কোনো রিটার্ন আসছে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তদন্তেও তালিকাবহির্ভূত কোম্পানিতে আইন লঙ্ঘন করে মিউচুয়াল ফান্ডের অর্থ বিনিয়োগের বিষয়টি ধরা পড়েছে। তাছাড়া মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের বিপরীতে আকর্ষণীয় রিটার্নও পাননি বিনিয়োগকারীরা। বিশেষ করে লভ্যাংশ হিসেবে রি-ইনভেস্টমেন্ট ইউনিট (আরআইইউ) দেয়ার কারণে এ খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীরা বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠেন। অবশ্য বিএসইসি ২০১৯ সালে মিউচুয়াল ফান্ডের লভ্যাংশ হিসেবে আরআইইউ প্রদানের সুযোগ রহিত করে শুধু নগদ লভ্যাংশ দেয়ার নির্দেশনা দেয়। মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর ইউনিটপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) ১০ টাকার বেশি হলেও অধিকাংশ মেয়াদি ফান্ডের ইউনিট পুঁজিবাজারে ১০ টাকার নিচে এমনকি ৫ টাকায়ও লেনদেন হচ্ছে।
এইমস অব বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইয়াওয়ার সাঈদ বলেন, মার্জিন ঋণ আমাদের পুঁজিবাজারের অস্থিতিশীলতার মূল কারণ। ঋণ নিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করার ফলে শেয়ারদর কমে গেলেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং তারা শেয়ার বিক্রি করে দিতে থাকে। অথচ সারা বিশ্বেই মানুষ তাদের সঞ্চিত অর্থ দীর্ঘমেয়াদের জন্য পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে। ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিন্তু মূল প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী নয়। তারা চাইলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারে। কিন্তু পুঁজিবাজারের মূল প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হচ্ছে পেনশন ফান্ড, প্রভিডেন্ট ফান্ড, ইন্স্যুরেন্স ফান্ড, মিউচুয়াল ফান্ড। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে সাধারণ মানুষ সম্পদ ব্যবস্থাপকদের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে থাকে। দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতের উন্নয়নকে সেভাবে গুরুত্ব না দেয়ার কারণেই খাতটি পুঁজিবাজারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারছে না। মিউচুয়াল ফান্ড কোন খাতে কী পরিমাণ বিনিয়োগ করবে সেটি নির্ধারণ করে দেয়াটা অনুচিত। এতে ফান্ডগুলোর বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ নিশ্চিত করা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। পাশাপাশি পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে সম্পদ ব্যবস্থাপকদের ফি নির্ধারণ করা উচিত। তাহলে ফান্ডের অর্থ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
দেশে বর্তমানে ৩৬টি মেয়াদি ও ৭৭টি বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড রয়েছে। এর মধ্যে মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। এ ফান্ডগুলোর আওতায় থাকা সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের তুলনায় বেমেয়াদি ফান্ডগুলো তুলনামূলক ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে সক্ষম হচ্ছে। তাছাড়া বেমেয়াদি ফান্ডের ইউনিট চাইলেই নির্ধারিত পুনঃক্রয়মূল্য অনুসারে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করতে পারছেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে এ ধরনের ফান্ডের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তুলনামূলক বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়া সংকটের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ভূমিকার বিষয়টি আবারো আলোচনায় এসেছে। এক্ষেত্রে বাজার স্থিতিশীলতায় মিউচুয়াল ফান্ডগুলোও তেমন একটা ভূমিকা রাখতে পারেনি। বিনিয়োগকারীদের আতঙ্ক দূর করতে শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থা হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়েছে। তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের শেয়ারদরের নিম্নসীমার ক্ষেত্রে ২ শতাংশ সার্কিট ব্রেকার আরোপ করে আপাত দরপতন ঠেকানো হয়েছে। অবশ্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বিশেষ করে মিউচুয়াল ফান্ড এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হলে বাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন হতো না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) প্রেসিডেন্ট মো. ছায়েদুর রহমান বলেন, মিউচুয়াল ফান্ডগুলো দেশের পুঁজিবাজারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না এটি সত্য। এক্ষেত্রে বেশকিছু দুর্বলতার কারণে খাতটি বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করতে পারছে না। বিশেষ করে মিউচুয়াল ফান্ড কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে সে বিষয়ে উদ্যোক্তার কোনো ভূমিকা নেই। অথচ ফান্ডে উদ্যোক্তার বিনিয়োগের অর্থ আটকে থাকছে। এ ধরনের পরিস্থিতি হলে যারা একবার মিউচুয়াল ফান্ডের উদ্যোক্তা হয়েছেন তারা দ্বিতীয়বার আর এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না। তাই মিউচুয়াল ফান্ডের যিনি উদ্যোক্তা হবেন তাকে বিনিয়োগ ফেরত নেয়ার সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদান্তে বিনিয়োগকৃত অর্থ নগদায়ন করা হলে এ খাতে বিনিয়োগের জন্য আগ্রহ তৈরি হবে বলে জানান তিনি।
#
অকা/পুঁবা/ বিকেল, ১৪ মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 4 years আগে

