অর্থকাগজ প্রতিবেদন

শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের জন্য বিদ্যমান ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতায় আংশিক ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। বিশেষ করে যেসব কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই শর্ত আগের মতো কঠোরভাবে কার্যকর হবে না।

গতকাল বুধবার অনুষ্ঠিত কমিশনের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার তত্ত্বাবধানে পুনর্গঠিত পরিচালনা পর্ষদের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হবে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন করে মূলধন সংগ্রহের পথ কিছুটা সহজ হয়ে গেল।

২০১০ সালের শেয়ার বাজার বিপর্যয়ের পর দেখা যায়, অনেক উদ্যোক্তা উচ্চমূল্যে নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে কোম্পানির পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়ান। এতে কোম্পানির প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা কার্যত কমে যায় এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকির মুখে পড়েন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০১১ সালে বিএসইসি নির্দেশনা জারি করে, যেখানে তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ বাধ্যতামূলক করা হয়।

নীতিটি শুরুতে বাজারে জবাবদিহি বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও সময়ের সঙ্গে কিছু জটিলতাও সামনে আসে। বিশেষ করে দুর্বল ও ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ম বা ব্যবস্থাপনা সংকটের কারণে পুরোনো পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হলেও নতুন পরিচালকদের জন্য স্বল্প সময়ে বাজার থেকে ৩০ শতাংশ শেয়ার সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর ফলে এসব কোম্পানি রাইট শেয়ার, বন্ড বা বোনাস শেয়ারের মাধ্যমে নতুন মূলধন তুলতে পারেনি।

মূলধনের অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানও ধীরে ধীরে কার্যক্রম সংকুচিত করেছে। একই সঙ্গে বছরের পর বছর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বিএসইসির নতুন সিদ্ধান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে। প্রথমত, পুনর্গঠিত পর্ষদ থাকা কোম্পানিগুলো এখন তুলনামূলক সহজে রাইট শেয়ার বা বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। এতে উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ বাড়বে।

দ্বিতীয়ত, নতুন বিনিয়োগকারী বা বড় শিল্পগোষ্ঠীর জন্য সংকটে থাকা কোম্পানির দায়িত্ব নেওয়া আরও সহজ হতে পারে। আগে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা অনেক সম্ভাব্য উদ্যোক্তার আগ্রহ কমিয়ে দিত। নতুন নীতিতে সেই চাপ অনেকটাই কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তৃতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে লোকসানি বা অচল কোম্পানিতে বিনিয়োগ আটকে থাকা সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্যও কিছুটা আশাবাদ তৈরি হয়েছে। কারণ কোম্পানিগুলো নতুন মূলধন সংগ্রহ করে ব্যবসায় ফিরতে পারলে শেয়ারের দাম ও লভ্যাংশ—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু শর্ত শিথিল করাই যথেষ্ট নয়। নতুন সুযোগ কাজে লাগিয়ে পুনর্গঠিত পর্ষদ যেন আবারও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। মূলধনের সঠিক ব্যবহার এবং করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলেই এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে।

সর্বশেষ হালনাগাদ 10 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version