নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
বাড়ির উঠানে পাশাপাশি দুটি কবর। একটিতে শায়িত মা, অন্যটিতে ভাই। কবর দুটির দিকে কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থাকেন কাজী মাজহারুল আনোয়ার। এরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘পূর্বাচলে আমার দাদা-নানার কবর ছিল। সরকারি অধিগ্রহণের পর সেগুলোও ভেঙে সেখানে প্লট করা হয়েছে। এখন কি আমার মায়ের কবরেরও একই পরিণতি হবে?’
কাজী মাজহারুল আনোয়ারের মতো নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ফুলবাড়িয়া, শিমুলিয়া, কুলাদি ও ব্রাহ্মণখালী মৌজার শত শত মানুষের জীবনেও যেন পুরোনো দুঃস্বপ্ন ফিরে এসেছে। তিন দশক আগে পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পের জন্য ভিটেমাটি হারিয়ে নতুন করে বসতি গড়েছিলেন তাঁরা। এবার একটি সরকারি সংস্থার বিশেষ প্রকল্পের জন্য আবারও তাঁদের জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রস্তাবিত অধিগ্রহণের আওতায় প্রায় ৩৮ দশমিক ৭৬ একর জমি রয়েছে। এর ফলে অন্তত ২০০ পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বসতভিটা, কৃষিজমি, পারিবারিক কবরস্থান ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন সহস্রাধিক মানুষ।
শনিবার সকালে সরেজমিনে রূপগঞ্জের দাউদপুর ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চারটি মৌজাজুড়ে বিরাজ করছে চাপা উৎকণ্ঠা। স্থানীয়দের মুখে ঘুরেফিরে একই প্রশ্ন—একবার সরকারি প্রকল্পের কারণে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেওয়ার পর আবারও কি তাঁদের উচ্ছেদ হতে হবে?
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নব্বইয়ের দশকে পূর্বাচল প্রকল্পের জন্য তাঁদের পূর্বপুরুষের বসতভিটা ও জমি অধিগ্রহণ করা হয়। অনেকে দাবি করেন, সে সময় নামমাত্র ক্ষতিপূরণ নিয়ে তাঁদের অন্যত্র চলে যেতে হয়েছিল। বহু কষ্টে নতুন জায়গায় ঘরবাড়ি তৈরি করে কৃষিকাজ ও ছোটখাটো ব্যবসার মাধ্যমে তাঁরা জীবন শুরু করেন। তিন দশক পর সেই নতুন ঠিকানাও এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত এক মাসে সরকারি সংস্থাটির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল কয়েক দফা এলাকায় এসে আকস্মিকভাবে পরিদর্শন ও সার্ভে করেছে। সংস্থাটির পরিকল্পনা বিভাগের এক কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত ভূমির তফসিল অনুযায়ী, রূপগঞ্জ উপজেলার রঘুরামপুর, ব্রাহ্মণখালী ও কুলাদি মৌজার মোট ৩৮ দশমিক ৭৬ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন।
তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে রঘুরামপুর মৌজায় ১৯ দশমিক ২১ একর, ব্রাহ্মণখালী মৌজায় ১৫ দশমিক ৮৫ একর এবং কুলাদি মৌজায় ৩ দশমিক ৭০ একর জমি রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো ধরনের গণশুনানি বা জনমত যাচাই ছাড়াই গোপনীয়ভাবে সার্ভে পরিচালনা করা হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, সরকারি নির্ধারিত মূল্যে জমি অধিগ্রহণ করা হলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সেই অর্থ দিয়ে অন্যত্র সমপরিমাণ জমি কিনে বসতি গড়তে পারবে না। ফলে তাঁরা একদিকে হারাবেন বসতভিটা, অন্যদিকে হারাবেন কৃষিজমি ও জীবিকার প্রধান উৎস।
পূর্বাচল প্রকল্পের কারণে একবার উচ্ছেদ হওয়া সায়েম ভূইয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পূর্বাচল থেকে একবার উচ্ছেদ করছে। আবার উচ্ছেদ করার চেষ্টা করতাছে। আমরা কি মানুষ না?’
তিনি বলেন, ‘এই এলাকায় প্রায় ২০০টি পরিবার বসবাস করে। শতাধিক মানুষের কবরও আছে। ভোটার আছে প্রায় ১৬শ। তাদের ছেলেমেয়ে আছে। এরা কোথায় যাবে? কীভাবে বেঁচে থাকবে? বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ কী হবে?’
আরেক ভুক্তভোগী নজরুল ইসলাম মোল্লা বলেন, ‘উপশহর থেইকা খেদাইয়া দিছে। উপশহরের বাইরে আইয়া বাড়ি করলাম। এহন হুনতাছি আবার আমাগো উচ্ছেদ কইরা দিবো। কন দেহি, আমরা আর কই যামু?’
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, প্রস্তাবিত অধিগ্রহণের আওতায় থাকা এলাকাগুলোর মানুষের বড় অংশ কৃষিনির্ভর। বছরের পর বছর ধরে এসব জমিতে চাষাবাদ করে তাঁদের সংসার চলে। জমি হারালে তাঁরা শুধু বসতভিটাই হারাবেন না, হারাবেন জীবিকা ও আয়-রোজগারের পথও।
কাজী মাজহারুল আনোয়ারের জীবনে ভিটেমাটি হারানোর ঘটনা নতুন নয়। পূর্বাচল উপশহরের জন্য বাপ-দাদার জমি ও বসতভিটা ছেড়ে রঘুরামপুর মৌজায় এসে নতুন করে সংসার গড়েছিলেন তিনি। প্রায় ৫ শতক জমির ওপর তৈরি করেছিলেন ছোট্ট একটি বাড়ি। এখন সেই বাড়িটিও প্রস্তাবিত প্রকল্পের কারণে উচ্ছেদের আশঙ্কায়।
শনিবার সকাল ১০টার দিকে ফুলবাড়িয়া গ্রামে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে নীল পলিথিনে ঢাকা পাশাপাশি দুটি কবর। একটি তাঁর মায়ের, অন্যটি ভাইয়ের।
কবর দুটির পাশে দাঁড়িয়ে কাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ‘আমরা কেমন রাষ্ট্রে বাস করি, যে রাষ্ট্র আমাদের বাসস্থানের নিরাপত্তা দিতে পারে না!’
ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা কী এই দেশের নাগরিক, নাকি রোহিঙ্গা? এইখান থেইকা সরায়ে দিলে আমরা কই যামু?’
তিনি বলেন, ‘আমার দাদা-নানার কবর ছিল পূর্বাচলে। অধিগ্রহণের পর সেগুলো ভেঙে প্লট বানানো হয়েছে। এখন আমার গর্ভধারিনী মায়ের কবরের দিকেও নজর পড়েছে। আমাদের সরিয়ে দিলে মায়ের কবর জিয়ারত করব কীভাবে?’
সংসারে নানা টানাপোড়েন থাকলেও ভিটেমাটি আঁকড়ে ধরে জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন কাজী আনোয়ার। তাঁর দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। এক ছেলে পঞ্চম শ্রেণিতে এবং আরেকজন প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে। বাড়িতে গিয়ে দেখা হয় প্রথম শ্রেণির ছাত্র কাজী রাফিনের সঙ্গে। হিরনাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীরও ভয়—তাঁদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হলে তার পড়াশোনা কীভাবে চলবে?
শিমুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা বৃদ্ধ আব্দুল মতিন বলেন, ‘বাপ-দাদার ভিটেমাটি আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি। এই মাটি ছেড়ে আমরা কোথায় যাব? সরকারি একটি সংস্থা নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে আমাদের উচ্ছেদ করতে চাইছে। ওই টাকা দিয়ে অন্য কোথাও এক টুকরো জমিও কেনা সম্ভব নয়।’
স্থানীয়দের দাবি, প্রস্তাবিত অধিগ্রহণের কারণে এলাকার কৃষক, দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। জমি হারালে কৃষকরা কর্মহীন হয়ে পড়বেন, আর বসতভিটা হারিয়ে অনেক পরিবারকে নতুন করে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হবে।
উপজেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রঘুরামপুর ও কটিয়াদি এলাকার সংশ্লিষ্ট মৌজাগুলোতে ভোটার সংখ্যা ১৬শর বেশি। স্থানীয়দের আশঙ্কা, অধিগ্রহণ কার্যকর হলে বিপুলসংখ্যক মানুষের স্থায়ী ঠিকানা ও নাগরিক জীবনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
এদিকে এলাকায় সরকারি সংস্থার সার্ভে টিমের আনাগোনা বাড়ার পর থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। গত কয়েক দিনে নারী-পুরুষ ও স্থানীয় যুবকদের নিয়ে একাধিক বৈঠকও হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, প্রয়োজনে আন্দোলনে নামলেও তাঁরা পৈতৃক ভিটেমাটি ছাড়তে রাজি নন।
বর্তমানে চারটি মৌজায় এক ধরনের থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের গণআন্দোলন শুরু হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দাবি, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ না করে সরকারি খাসজমি ব্যবহার করে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হোক। একই সঙ্গে তাঁরা প্রস্তাবিত অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে তাঁদের বসতভিটা ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকার কথা জানিয়েছেন রূপগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফরিদ আল সোহান। তিনি বলেন, প্রায় এক মাস আগে তথ্য যাচাই-বাছাই করে জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সরকার চাইলে ভূমি অধিগ্রহণ করতে পারে। সেক্ষেত্রে যার জমি অধিগ্রহণ করা হবে, তাঁকে সরকারের পক্ষ থেকে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।’
কোনো ব্যক্তি বা পরিবার নির্দিষ্টভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে লিখিত অভিযোগ করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘কেউ ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমার কাছে লিখিত অভিযোগ করলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।’
সর্বশেষ হালনাগাদ 5 hours আগে

