বিনোদন প্রতিবেদক>

বাংলাদেশে ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে এমন কিছু গান রয়েছে, যা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে চিরসবুজ ও কালজয়ী হয়ে বেঁচে থাকে। ঘরোয়া কিংবা আনুষ্ঠানিক গানের আসর, ছুটির দিন বা শ্রাবণের রিমঝিম বৃষ্টি—এমন মুহূর্তগুলোতে যে গানটি অবধারিতভাবে বেজে ওঠে এবং শ্রোতাদের স্মৃতিকাতর করে তোলে, তা হলো ডিফ্‌রেন্ট টাচ ব্যান্ডের ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’।

​সম্প্রতি গানটি নতুন করে দেশের মানুষের মুখে মুখে ফিরছে এবং নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশের একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রাণী পালের একটি রিল ভিডিওকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি যে অনভিপ্রেত সাইবার বুলিংয়ের ঘটনা ঘটেছিল, তার প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন শিক্ষক সমাজসহ দেশের বরেণ্য ও বিনোদন অঙ্গনের তারকারা। এই ঘটনার রেশ ধরেই আজ ফিরে দেখা যাক এই চর্চিত ও জনপ্রিয় গানটির সৃষ্টির নেপথ্য ইতিহাস।

​সহজ-প্রাঞ্জল কথা ও সুরের এই গানটির সঙ্গে শ্রোতারা খুব সহজেই একাত্ম হয়ে যান। প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই এটি ডিফ্‌রেন্ট টাচের সিগনেচার গানে পরিণত হয়। বর্তমানে উঠতি ব্যান্ডগুলো বা যারা অন্য ব্যান্ডের গান কাভার করে থাকে, তাদের পছন্দের তালিকার শুরুতেই থাকে এই গানটি। শ্রোতাদের আকাশছোঁয়া গ্রহণযোগ্যতাই এর মূল কারণ।

শ্রাবণের এক অবিরাম বৃষ্টির রাত

​খুব কম মানুষই জানেন যে গানটির জন্ম হয়েছিল কোনো এক শ্রাবণের গভীর রাতে। স্মৃতিচারণা করে গানটির গীতিকার ও সুরকার আশরাফ বাবু জানিয়েছেন সেই পেছনের গল্প।

​সময়টা প্রায় ৪০ বছর আগের, অর্থাৎ ১৯৮৭ সালের শ্রাবণ মাস। তখন একটানা চার দিন ধরে বৃষ্টি পড়ছে। মানুষের বাড়ি থেকে বের হওয়া দুরূহ। ডিফ্‌রেন্ট টাচের নতুন অ্যালবামের জন্য ১২টি গানের কোটা পূরণের শেষ মুহূর্তে এসে একটি গান ঘাটতি ছিল। কারণ, তখন ১২টি গান নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম প্রকাশের প্রচলন ছিল।
​বাকি সব গান হয়ে গেলেও শেষ গানটির দায়িত্ব পড়ে আশরাফ বাবুর ওপর। কিন্তু কিছুতেই সুর বা কথা আসছে না, আর ওদিকে বাইরে অবিরাম ঝরছে বৃষ্টি। শেষ রাতের দিকে জানালার পাশে বসে শ্রাবণের বৃষ্টিধারা দেখতে দেখতে তাঁর মাথায় এল—এই বৃষ্টি নিয়ে একটি গান লিখলে কেমন হয়? কিছুদিন ধরে রাস্তায় চলতে-ফিরতে মাথার মধ্যে কিছু কথা ঘুরছিল। সেই ভাবনা থেকেই তিনি খাতা-কলম নিয়ে বসে যান।
​আশরাফ বাবু লেখা শুরু করলেন:
​‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে,/ অঝোরে নামবে বুঝি শ্রাবণে ঝরায়ে...।’
​ভোররাতের দিকে পুরো ১২ লাইনের গানটি শেষ করে তিনি স্বস্তি পান। এরপর ঢাকা থেকে খুলনা ফিরে যান দলের সদস্যরা। একদিন হঠাৎ করে খুলনা নিউমার্কেটের একটি ক্যাসেটের দোকানে প্রথম নিজেদের গাওয়া গানটি শুনতে পান তাঁরা। ইলেকট্রা ভয়েস থেকে প্রকাশিত এই অ্যালবামে গানটি প্রথম গেয়েছিলেন আলী আহমেদ বাবু, আর মূল অ্যালবামের জন্য গেয়েছেন ব্যান্ডের অন্যতম ভোকাল মেজবাহ রহমান।

​গানটিকে ঘিরে রয়েছে বেশ কিছু মজার ও কাকতালীয় ঘটনা। ডিফ্‌রেন্ট টাচের কণ্ঠশিল্পী মেজবাহ এক সাক্ষাৎকারে এমন একটি অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছিলেন। ১৯৯১ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে এক কনসার্টে অংশ নেয় ডিফ্‌রেন্ট টাচ। বৃষ্টিমুখর সময়কে উপজীব্য করে রচিত ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি শুরুর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সত্যি সত্যি আকাশ ভেঙে বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। খোলা জায়গা হওয়ার কারণে সেদিন আর কনসার্ট চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
​সবচেয়ে মজার এবং বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এর পরের বছর ঠিক একই জায়গায় আরেকটি কনসার্টে যখনই ডিফ্‌রেন্ট টাচ এই গানটি গাওয়া শুরু করল, আবারও হুট করে বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়!

সর্বশেষ হালনাগাদ 3 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version