অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
ব্যাংক ও বিমা কোম্পানির অংশিদারত্বে কমিশনভিত্তিক আয় বাড়ার ফলে আয়ের নতুন পথ তৈরি হবে।
১৬ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার এই দেশে এক শতাংশেরও কম মানুষের বিমা আছে। বিভিন্ন ইনস্যুরেন্স ক্রস সেল, আপ সেলের জন্য গ্রাহকদের ব্যাপারে পর্যাপ্ত তথ্য আছে ব্যাংকগুলোর কাছে।
বাংলাদেশে মোট তফসিলি ব্যাংক আছে ৬০টি। ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসের তথ্যানুযায়ী, এসব ব্যাংকের মোট ১০ হাজার ৮০৩টি শাখা আছে। অন্যদিকে, দেশে ইনস্যুরেন্স কোম্পানি আছে ৭৯টি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের তথ্যানুযায়ী, এসব কোম্পানির মোট এজেন্টসংখ্যা ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭২।
এছাড়া বাংলাদেশে আরও বেশিসংখ্যক মানুষকে বিমার আওতায় আনা সহজ হবে ব্যাংকাস্যুরেন্স চালু হলে। বিমা করতে দেশব্যাপী ব্যাংকের শাখা থাকার সুফল মিলবে।
ব্যাংকাস্যুরেন্স চালু হলে ব্যাংক-বিমা উভয় খাতই লাভবান হওয়ার পাশাপাশি মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে এটি একটি মাইলফলক হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, ইনস্যুরেন্সের একটা বড় সমস্যা হলো বিশ্বাস। ব্যাংকাস্যুরেন্স চালু হলে এ সমস্যার সমাধান হবে। ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট থাকা ১১ কোটি মানুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিমা সুবিধায় চলে আসবে। বিমা কোম্পানিগুলো বিপুলসংখ্যক গ্রাহক পাবে। একইসঙ্গে ব্যাংকগুলোর সুদ-বহির্ভূত আয় বাড়বে।'
১৯৮০-র দশকে ইউরোপে উদ্ভূত হওয়া ব্যাংকাস্যুরেন্স এখন সারা বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ২০২০ সালে ব্যাংকাস্যুরেন্সের বৈশ্বিক বাজার ১.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ভৌগলিক ফ্রন্টে, অনুকূল কর কাঠামো থাকায় এ বাজারের শীর্ষস্থান দখল করেছে ইউরোপ। স্পেনে জীবনবিমার প্রিমিয়াম আয়ের ৬৫%, ফ্রান্সে ৬০%, বেলজিয়াম ও ইতালিতে ৫০% আসে ব্যাংকাস্যুরেন্স থেকে। এই দেশগুলোতে মাত্র দশ বছরে ব্যাংকাস্যুরেন্স একটি সফল মডেল হিসেবে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ও স্বীকৃতি পেয়েছে।
চীন ও ভারতের মতো উদীয়মান বাজারগুলোতে ব্যাংকাস্যুরেন্স বাজারের উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। এ দেশগুলো ব্যাংকাস্যুরেন্স মডেলের সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং বেসরকারি বিমা কোম্পানিগুলোকে ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হতে উৎসাহিত করার জন্য উপযুক্ত নিয়ম গ্রহণ করেছে।
মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, হংকংসহ এশিয়াজুড়েই ব্যাংকাস্যুরেন্স সুপ্রতিষ্ঠিত। দক্ষিণ এশিয়ায় ভুটান, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও মায়ানমারে ব্যাংকাস্যুরেন্স সুবিধা চালু রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ ও দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনও বিমার মাধ্যমে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে।
দেশে আর্থিক খাতের জন্য কার্যকর ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ অনুযায়ী কোনো ব্যাংকের ইনস্যুরেন্স ব্যবসা করার সুযোগ নেই। তবে সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৭(৩) ধারার নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক কোম্পানি স্টক-ব্রোকার, স্টক-ডিলার, মার্চেন্ট ব্যাংকার, পোর্টফোলিও ম্যানেজার হিসেবে বা সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন থেকে নিবন্ধন গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে—এ ধরনের ব্যবসায় সরাসরি যু্ক্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও কারিগরি কমিটির সদস্য জানিয়েছেন, ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ১২০(২)/(৩) ধারার আওতায় ব্যাংকগুলোর জন্য ব্যাংকাস্যুরেন্সের প্রবিধান প্রণয়ন ও প্রচার করার ক্ষমতা পাবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
অন্যদিকে, বীমা আইন ২০১০-এর আওতায় নিয়ন্ত্রকদের কাছ থেকে উপযুক্ত নিবন্ধন পাওয়ার পর কর্পোরেট সংস্থাগুলো 'বীমা এজেন্ট' হিসাবে কাজ করার অনুমতি পাবে। আইনটির ২(২৯) ধারার সংজ্ঞা অনুসারে 'বীমা এজেন্ট' অর্থ, এই আইনের অধীন নিবন্ধিত কোনো ব্যক্তি, যিনি কমিশন বা অন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করে বা গ্রহণে সম্মত হয়ে বিমা পলিসি সচল, নবায়ন বা পুনরুজ্জীবিতকরণসহ বীমা ব্যবসা আহরণ ও সংগ্রহ করেন। ২(৩২) ধারা অনুসারে, 'ব্যক্তি' অর্থ যেকোনো ব্যক্তি ও কোনো প্রতিষ্ঠান, কোনো কোম্পানি, কোনো অংশীদারী কারবার, ফার্ম বা অন্য যেকোনো সংস্থাও এর অন্তর্ভুক্ত হবে।
ব্যাংকাস্যুরেন্স ব্যবসার জন্য একটি দেশ বেশ কিছু মডেল অবলম্বন করতে পারে। তবে এটি নির্ভর করে রেগুলেটরি ও ট্যাক্স ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ব্যাপ্তি, ঠিক কতটুকু পরিধি পর্যন্ত ব্যাংক ও বিমা সংশ্লিষ্টরা কাজ করতে ইচ্ছুক এবং দেশের ব্যাংকিং ও বিমা খাতের আকৃতি ও গঠন ইত্যাদির ওপর।
ক্রস শেয়ারহোল্ডিং-এর ক্ষেত্রে কোনো ব্যাংক ইচ্ছে করলে ওয়ান-স্টপ আর্থিক সার্ভিসের মাধ্যমে তার সেবায় বৈচিত্র্য আনতে পারে। আবার কোনো বিমা কোম্পানি চাইলে কোনো ব্যাংকের ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল ও সেবাগ্রহীতাদের লেভারেজ প্রদান করতে পারে। এর বাইরে কোনো ব্যাংক সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে একটি বিমা কোম্পানি অধিগ্রহণ করতে পারে। কোনো ব্যাংক চাইলে নিজেদের মালিকানাতেই নতুন একটি বিমা কোম্পানি প্রতিষ্ঠা বা তৈরি করতে পারে। একটি কমন গ্রুপের মালিকানাধীন কোনো ব্যাংক ও বিমা কোম্পানিও চাইলে তা করতে পারে।
পুরোপুরি সমন্বিত পদ্ধতিতে কাজ পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও সেবা প্রদানের সম্ভাব্যতা রয়েছে ব্যাংকান্স্যুরেন্স মডেলে। ব্যাংকগুলোর ইতিমধ্যে থাকা সেবাগ্রহীতাদের লেভারেজ, ওয়ান-স্টপ ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসেস প্রোডাক্টস ইত্যাদি ক্ষেত্রেও উচ্চ সক্ষমতা রয়েছে এ মডেলের। তবে এসব কিছুর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন পুঁজির বিনিয়োগ, ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা ইত্যাদি। এছাড়া আর্থিক সেবার ক্ষেত্রে নিয়মকানুনজনিত সীমাবদ্ধতা তো রয়েছেই।
বিমা খাতে দক্ষ কর্মীর অভাব; ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিমা ব্যবসায় বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও দক্ষতার অভাব; ব্যাংক ও বিমার পণ্য, কৌশল ও আয়ের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সাংস্কৃতিক পার্থক্য; ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন শাখার মধ্যকার নেটওয়ার্কিংয়ে দুর্বলতা ইত্যাদি ব্যাংকাস্যুরেন্সের প্রধান দুর্বলতা।
ব্যাংকাস্যুরেন্স-বিষয়ক সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ সুবিধার ব্যবস্থাও বর্তমানে নেই।
এছাড়া আজকাল গ্রাহকরা ব্যাংকে যান কেবল টাকা রাখা বা তোলার মতো ছোটখাটো কাজের জন্য। কারণ, এটিএম ও ই-ব্যাংকিং সুবিধার জন্য বেশিরভাগ গ্রাহকই এখন আর ব্যাংকমুখী হন না।
#
অকা/বীখা/ দুপুর, ২৪ এপ্রিল, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 4 years আগে

