অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বাংলাদেশের শেয়ার বাজার সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে চাপে পড়েছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রত্যাহারের কারণে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা মিলিয়ে গত মার্চ মাসে বিদেশিরা বড় অঙ্কের অর্থ বাজার থেকে তুলে নিয়েছেন। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাজারের স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর।
বিশেষ করে শক্তিশালী মৌলভিত্তির বা ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রির চাপ ছিল সবচেয়ে বেশি। অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, ব্র্যাক ব্যাংক এবং গ্রামীণফোনের মতো সুপ্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর শেয়ার বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সাধারণত এই ধরনের কোম্পানিগুলোকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়, তাই এসব শেয়ারে বিক্রির প্রবণতা বাজারের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মার্চ মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পুরো মাসে তাদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২৭২ কোটি টাকা, যা আগের মাস ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রায় ৫৯ শতাংশ কম। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই লেনদেনের মধ্যে বিক্রির পরিমাণ ছিল ২১৫ কোটি টাকা, যেখানে ক্রয়ের পরিমাণ মাত্র ৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, বাজারে নতুন বিনিয়োগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ বেরিয়ে গেছে, যা বাজারের তারল্য কমিয়ে দিয়েছে।
কোম্পানি ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি বিক্রির চাপ পড়েছে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজে। এ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৭৬ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা, ফলে তাদের মালিকানার হারও কমে এসেছে। এর পরেই রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, যেখান থেকে প্রায় ৩৪ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি হয়েছে। এছাড়া স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস এবং গ্রামীণফোন থেকেও যথাক্রমে ৩২ কোটি ও ২৯ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করা হয়েছে।
এছাড়াও রেনাটা লিমিটেড, সিটি ব্যাংক এবং ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের মতো বড় প্রতিষ্ঠান থেকেও বিদেশিরা তাদের বিনিয়োগ কমিয়েছেন। বিএসআরএম, লাফার্জহোলসিম, মারিকো এবং আইডিএলসি ফিন্যান্সের মতো কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। তবে এর বিপরীতে কিছু ছোট কোম্পানি, যেমন ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স ও রিং শাইন টেক্সটাইল—এ সীমিত পরিসরে বিদেশি বিনিয়োগ কিছুটা বেড়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে বৈশ্বিক ও স্থানীয় উভয় কারণই দায়ী। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে জ্বালানি তেলের দাম ও ডলারের বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থাও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এর পাশাপাশি শেয়ার বাজারে সুশাসনের ঘাটতি, অনিয়ম এবং দুর্বল বা ‘জাঙ্ক’ শেয়ারের আধিক্য বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে তারা তুলনামূলক নিরাপদ বাজারের দিকে ঝুঁকছেন।
অর্থবছরের শেষ প্রান্তে এসে এই ধরনের বিনিয়োগ প্রত্যাহার বাজারের জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি সংসদে জানিয়েছেন, বাজারে অনিয়ম ও কারসাজি প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তদন্ত প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে বাজারকে আরও স্বচ্ছ ও আধুনিক করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বর্তমান পরিস্থিতি শেয়ার বাজারের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও যথাযথ নীতিগত পদক্ষেপ এবং সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। ●
অকা/পুঁবা/ই/সকাল/৮ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 5 hours আগে

