অর্থকাগজ প্রতিবেদন
ঋণপত্র বা এলসির দেনা পরিশোধে রফতানি আয়ের ডলার এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় মহাবিপাকে পড়েছেন বড় রফতানিকারকরা। এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে ডলার স্থানান্তর করতে না পারায় এলসির দেনা পরিশোধ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এতে রফতানিকারকের কোনো কোম্পানির নামে এক ব্যাংকে থাকা ডলার দিয়ে অন্য ব্যাংকে একই রফতানিকারকের অন্য কোনো এলসির দেনা পরিশোধ করা যাচ্ছে না। সংকটের কারণে অন্য কোনো ব্যাংক থেকে ডলার কিনে দেনা শোধ করার মতো পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রাও বাজারে নেই। এদিকে নির্ধারিত সময়ে দেনা শোধ করতে না পারায় একদিকে ব্যাংকের দুর্নাম হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রাহকেরও দুর্নাম হচ্ছে।
ঋণের বিপরীতে বাড়তি সুদ পরোক্ষভাবে রফতানিকারককেই দিতে হচ্ছে। এতে রফতানিকারকরা দুইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একদিকে সময়মতো দেনা শোধ না করায় দুর্নাম হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়তি সুদ দিতে হচ্ছে। ফলে রফতানি পণ্যেও উৎপাদন খরচ বাড়বে। এতে বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমবে। যা ক্ষতিগ্রস্ত করবে দেশের অর্থনীতিকে।
এছাড়া রফতানিকারকরা ডলার ৩০ দিনের বেশি ধরে রাখতে পারছেন না। নিজ কোম্পানির বিপাকের মাধ্যমে অর্জিত ডলার ৩০ দিনের মধ্যে ব্যবহার না করলে ব্যাংক নগদায়ন (গ্রাহকের টাকা দিয়ে সমপরিমাণ ডলার নিয়ে যাচ্ছে) করে নিচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের (৩০ দিন) পর সংশ্লিষ্ট রফতানিকারক এলসি খুলতে গেলে বাজার থেকে ডলার কিনতে হচ্ছে। কিন্তু সংকটের কারণে বাজারে চাহিদা অনুযায়ী ডলার পাওয়া যায় না। ফলে এলসি খোলাও বাধাগ্রস্ত হয়। এতে বিশেষ করে রফতানি বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রফতানিকারকরা জানান, বাজারে এখন তীব্র ডলার সংকট চলছে। এর মধ্যে নিজস্ব ব্যবস্থা ছাড়া এলসি খোলার মতো পর্যাপ্ত ডলার মিলছে না। এ অবস্থায় ডলার স্থানান্তরে নিষেধাজ্ঞার ফলে নতুন এলসি খোলার ক্ষেত্রে যেমন জটিলতা আরও বাড়বে। তেমনি এলসির দেনা শোধের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ হবে। একই সঙ্গে বাজারে ডলারের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হবে। ফলে সংকট আরও ঘনীভূত হবে।
৪ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সার্কুলার জারি করে বলেছে, ওইদিন থেকে কোনো ব্যাংক রফতানিকারকের নামে আসা ডলার দিয়ে ব্যাক টু ব্যাক এলসির দায় শোধের পর অবশিষ্ট যে ডলার থাকবে সেগুলো এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে স্থানান্তর করা যাবে না।
একই সঙ্গে রফতানিকারক কোনো ডলার ৩০ দিনের মধ্যে ব্যবহার না করলে ব্যাংক নিজ দায়িত্বে তা নগদায়ন করে অন্য কাজে ব্যবহার করতে পারবে। আগে রফতানিকারকের অর্জিত ডলার থেকে ভ্যালু এডেড বা মূল্য সংযোজিত অংশ অর্থাৎ ব্যাক টু ব্যাক এলসির দায় শোধ করে যে ডলার রফতানিকারকের অ্যাকাউন্টে থাকত তা অন্য ব্যাংকে স্থানান্তর করা যেত। এখন সেটি করা যাবে না।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, নতুন নিয়মের ফলে বড় রফতানিকারকদের সমস্যা বেশি হবে। কারণ ব্যাক টু ব্যাক এলসির দেনা শোধের পর ছোট রফতানিকারকদের কাছে তেমন ডলার থাকে না। বড় রফতানিকারকদের কাছে বেশ ডলার থাকে।
এগুলো তারা পরে বিভিন্ন খাতে ব্যবহার করে। একজন রফতানিকারকের বহুমুখী ব্যবসা থাকে। রফতানি পাশাপাশি শিল্পের যন্ত্রপাতি, বাণিজ্যিক শিল্পের কাঁচামালসহ অনেক কিছুই আমদানি করতে হয়। ঝুঁকি এড়াতে একই ব্যবসায়ী বিভিন্ন ব্যাংকে হিসাব খুলে ব্যবসা করেন। এ কারণে এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে ডলার স্থানান্তর করে ব্যবহার করতে হয়। নতুন নিয়মের ফলে এখন সেটি বন্ধ হয়ে গেল।
এতে এক ব্যাংকে থাকা ডলার দিয়ে অন্য ব্যাংকের এলসি দেনা শোধের ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হবে। আগে এক্ষেত্রে কোনো সমস্যার সৃষ্টি হতো না। এখন এক্ষেত্রে একটি বড় বাধা এলো। আগে এলসির দেনা শোধে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যেত, এখন তা করা যাবে না।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, ডলারের অপব্যবহার থামাতে ওই বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। এতে ডলার ধরে রাখার প্রবণতা কমবে। ফলে বাজারে ডলারের প্রবাহ বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যাংক এক মাসের মধ্যে ডলার নগদায়ন করলে সংকটও কিছুটা কমবে। তখন ব্যাংক অন্য এলসির ক্ষেত্রে এসব ডলার ব্যবহার করতে পারবে।
সূত্র জানায়, বড় শিল্প গ্রুপগুলোর রফতানি বাণিজ্যের পাশাপাশি বড় ধরনের আমদানি বাণিজ্যও রয়েছে। অনেক রফতানিকারক ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা করেন। এসব পণ্য আমদানি করতে রফতানি আয়ের ডলারই অন্য ব্যাংকে স্থানান্তর করে তারা ব্যবহার করেন। একই সঙ্গে উদ্যোক্তারা চালু শিল্পের আধুনিকায়নের জন্য যন্ত্রপাতি আমদানি করেন। নতুন শিল্প স্থাপন করতেও যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়। এসব খাতে এলসি খুলতে এখন ব্যাংক চাহিদা অনুযায়ী ডলারের জোগান দিতে পারছে না। যে কারণে অনেক উদ্যোক্তাই রফতানি ডলার অন্য ব্যাংকে নিয়ে বাণিজ্যিক এলসি খুলতেন। এখন সেটি সম্ভব হচ্ছে না।
উদ্যোক্তারা বলেছেন, নতুন নিয়মের ফলে অন্য ব্যাংকের এলসি দেনা পরিশোধে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। ডলার থাকা সত্ত্বেও তারা ডলার স্থানান্তর করতে পারছেন না।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, নতুন নিয়মটা রফতানিকারকদের জন্য খুবই পীড়াদায়ক হয়েছে। যে ব্যাংকের মাধ্যমে রফতানি ডলার এসেছে, সে ব্যাংকের দায় পরিশোধ করে অতিরিক্ত ডলার দিয়ে অন্য ব্যাংকের দায়দেনা পরিশোধ করতে পারছেন না রফতানিকারকরা। এতে ভালো গ্রাহকও খেলাপি হয়ে যাবে। এটা জরুরি ভিত্তিতে প্রত্যাহার করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক রফতানিকারকদের অনেক সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে, সেটা অস্বীকার করছি না। তবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের মতামত নিতে পারলে ভালো হয়। নতুন নিয়ম করার আগে রফতানিকারকদের সঙ্গে বসলে সমস্যাটা তুলে ধরা যেত।
সূত্র জানায়, ডলারের নতুন দর অনুযায়ী আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি ডলার কিনতে হচ্ছে ১১০ টাকা করে। রফতানি প্রতি ডলারের বিপরীতে গ্রাহকরা পাচ্ছেন ১০৯ টাকা ৫০ পয়সা। একই উদ্যোক্তা যদি রফতানিকারক ও আমদানিকারক হন তাহলে তাকে গড়ে প্রতি ডলার ৫০ পয়সা লোকসান দিতে হচ্ছে।
রফতানি ডলার থেকে ‘ব্যাক টু ব্যাক’ এলসির দায় মিটিয়ে যে ডলার থাকে তার একটি অংশ রফতানিকারক রিটেনশন কোটায় নিতে পারেন। বাকি ডলার ৩০ দিনের মধ্যে একই ব্যাংকে কাজে লাগাতে হবে। তা না হলে ব্যাংক নিজ উদ্যোক্তা ওইসব ডলার নগদায়ন করে নেবে। এক্ষেত্রে রফতানিকারককে দেওয়া হবে ১০৯ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু রফতানিকারক আবার যখন বাণিজ্যিক বা শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খুলবেন তখন তাকে ১১০ টাকা দিয়ে ডলার কিনতে হবে।

অকা/তৈপোশি/ সকাল, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 2 years আগে

Leave A Reply

Exit mobile version