অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে তৈরি পোশাক রফতানিতে চীনের পর বাংলাদেশের অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা মন্থরতার মধ্যেও ইউরোপে বাংলাদেশের বাজার অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব দাঁড়িয়েছে ২১.৫৭ শতাংশে, যা দেশটিকে ইইউতে দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী হিসেবে স্থায়ী অবস্থান ধরে রাখতে সহায়তা করেছে।

পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্টেট-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক আমদানির মোট পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানি প্রায় ৮ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকায় (সমমান হিসাব অনুযায়ী)। একই সময়ে বাংলাদেশ তার রফতানি আয় বাড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা থেকে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ পাঁচ বছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৩৬ শতাংশ, যা প্রতিযোগী অনেক দেশের তুলনায় বেশি।

তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, একই সময়ে চীনের রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ২১.৪৮ শতাংশ এবং ভারতের ৩৩.১৮ শতাংশ। অন্যদিকে তুরস্কের রফতানি কমেছে প্রায় ৯.৪৮ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখায় যে প্রবৃদ্ধির দিক থেকে বাংলাদেশই তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছে।

২০২২ সালে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ওই বছর রফতানি আয় প্রায় ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয় এবং বাজার অংশ দাঁড়ায় ২২.০৬ শতাংশে। তবে ২০২৩ সালে ইউরোপে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ায় রফতানি আয় কিছুটা কমে প্রায় ২ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসে। তবুও বাংলাদেশের বাজার অংশ ২০ শতাংশের ওপরে ধরে রাখা সম্ভব হয়, যা শিল্পটির স্থিতিশীলতা ও সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। ২০২৪ সাল থেকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যেতে শুরু করে এবং ২০২৫ সালে রফতানি আয় আবারও বেড়ে প্রায় ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকায় পৌঁছায়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ বেশি।

দেশের রফতানি খাতের প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো জানিয়েছে, ইউরোপ এখনও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য। দেশের মোট পণ্য রফতানির ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, যার বড় অংশই ইউরোপীয় বাজারে যায়।

ইইউ বাজারে শীর্ষ অবস্থানে এখনও রয়েছে চীন। ২০২১ সালে দেশটির বাজার অংশ ছিল ৩০.২৮ শতাংশ। যদিও ২০২৩ সালে তা কিছুটা কমে ২৭.৮৫ শতাংশে নেমে আসে, ২০২৫ সালে আবার বেড়ে ২৯.৫৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবুও বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ভবিষ্যতে এই ব্যবধান আরও কমিয়ে আনতে পারে।

২০২৫ সালের হিসাবে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে তুরস্ক, যার বাজার অংশ ৯.২৭ শতাংশ। এরপর রয়েছে ভারত ৫.০৩ শতাংশ এবং কম্বোডিয়া ৪.৯৯ শতাংশ নিয়ে।

পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলেই বাংলাদেশের এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই ইউরোপীয় ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য বড় সাফল্য।

অন্যদিকে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি-এর সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের সামনে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। তাই শিল্পখাতকে টিকিয়ে রাখতে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালী করা, দক্ষ জনবল তৈরি করা, বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা এবং গ্রিন ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠার কারণে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও শক্ত হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হলে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং নতুন বাজার খোঁজার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

সামগ্রিকভাবে গত পাঁচ বছরের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে যে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মধ্যেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প তার সক্ষমতা, স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা অর্জনের ক্ষমতা বজায় রেখেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউরোপীয় বাজারে এই অগ্রগতি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে।

অকা/তৈপোশি/ই/সকাল/৫ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 1 hour আগে

Leave A Reply

Exit mobile version