অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চলমান অনিশ্চয়তার মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি বছরের জুন মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬.৪০%-এ, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এটি চলতি বছরের দ্বিতীয়বারের মতো ৭%-এর নিচে নেমে এল। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছিল ৬.৮২%-এ। সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও ঋণ প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে ৭%-এর আশেপাশে ঘোরাফেরা করেছে, কিন্তু আর বাড়েনি। গত মে মাসে ছিল ৭.১৭%, এপ্রিলে ৭.৫০%, মার্চে ৭.৫৭%, জানুয়ারিতে ৭.১৫%, আর গত বছরের ডিসেম্বরে ছিল ৭.২৮%।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম)-এর নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তাফা কে মুজেরি বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ এবং আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহিত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক খাতের দুরবস্থা।
তিনি আরও বলেন, গত কয়েক বছরে ব্যাংক খাতে ব্যাপক অনিয়মের কারণে তারল্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর ফলে ঋণ প্রদানের সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। একইসঙ্গে বর্ধমান অনাদায়ী ঋণ (NPL) ব্যাংকগুলোকে আরও সতর্ক করে তুলেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক হ্রাস বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। এর প্রভাবে নতুন শিল্প স্থাপন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রবণতা কমে যাচ্ছে, যার ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি শ্লথ হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে এই প্রবণতায় কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে না। বরং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ আরও কমে যেতে পারে। পাশাপাশি, বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক শুল্ক আরোপের বিষয়ে সমাধানের অভাবও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গত এক বছরে নীতিগত সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় ঋণগ্রহণ খরচ বেড়েছে। এর ফলে নতুন বিনিয়োগকারীরা পিছিয়ে যাচ্ছেন, যা বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমার আরেকটি বড় কারণ।
ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ফলে অর্থনীতিতে যে প্রভাবগুলো পড়ছে তা হলো— নতুন শিল্প স্থাপন ও ব্যবসা সম্প্রসারণে মন্দা, বেকারত্বের চাপ বৃদ্ধি, সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাসের আশঙ্কা এবং ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট আরও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই প্রবণতা মোকাবিলায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, ব্যাংক খাতে অনিয়ম রোধ ও অনাদায়ী ঋণ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/২৭ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 7 months আগে

