অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বাংলাদেশ অবশেষে টানা চার বছর পর ডলার সংকটের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, এখন ডলার খরচের চেয়ে আয় বেশি। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং টাকার মানও স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। ডলারের দাম নতুন করে বাড়েনি, বরং ১২২–১২৩ টাকার মধ্যে স্থির রয়েছে। আমদানি বাণিজ্যও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে; আমদানি ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি পূর্বের বকেয়া ঋণও পরিশোধ করা যাচ্ছে। এতে করে ডলার ঘাটতি থেকে সৃষ্ট প্রবল অর্থনৈতিক চাপও কমতে শুরু করেছে। তবে রফতানি আয় ও প্রবাসী আয়—এই দুই উৎসের ওপর সরকারের কৌশলগত নির্ভরতা বাড়ছে। সরকার বাজারে স্থিতি বজায় রাখতে কৃত্রিমভাবে ডলারের দাম ধরে রাখছে, ফলে আয় বেশি হলেও আপাতত ডলারের দাম কমছে না।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ডলার সংকট কাটিয়ে ওঠা ইতিবাচক হলেও এটিকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রাখা হবে আসল চ্যালেঞ্জ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, “ডলার সংকট কমেছে ঠিকই, কিন্তু এর মূল কারণ ছিল অবৈধ অর্থপাচার। বর্তমান সরকার এ খাতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে বলে প্রবাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স স্থায়ীভাবে না বাড়লে আবারও সংকট দেখা দিতে পারে।”
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান মনে করেন, “এখনকার ইতিবাচক পরিস্থিতি অনেকাংশে কড়াকড়ি আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও হুন্ডি দমন প্রচেষ্টার ফল। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এটি টেকসই নয়। প্রকৃত সমাধান আসবে রফতানি বৈচিত্র্যকরণ ও আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স আরও বাড়াতে পারলে।”
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছে যে, বৈশ্বিক মন্দা কাটলেই আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়বে। তখন চলতি হিসাবে আবারও ঘাটতি দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশকে এখন থেকে রফতানি আয়ের বাজার বাড়ানো এবং প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, টানা প্রায় নয় বছর ধরে বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবে ঘাটতি ছিল। সর্বশেষ ২০১৫–১৬ অর্থবছরে ৪২৬ কোটি ২০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত দেখা গেলেও এরপর থেকে টানা ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত প্রতি বছর ঘাটতি বেড়েছে। ২০২১–২২ অর্থবছরে রেকর্ড ১,৮৬৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার ঘাটতি হয়। এরপর আমদানি নিয়ন্ত্রণ করায় ঘাটতি কিছুটা কমলেও, রিজার্ভে চাপ অব্যাহত থাকে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রিজার্ভ নেমে আসে ২,৫৮২ কোটি ডলারে, যেখানে নিট রিজার্ভ ছিল মাত্র ২,০৩৯ কোটি ডলার। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ধীরে ধীরে ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় এবং আগস্ট ২০২৫-এ রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়ায় ৩,০৮৭ কোটি ডলারে।
ডলারের দামের ওঠানামার ইতিহাসও এ সংকটের প্রতিচ্ছবি। ২০২১ সালের আগস্টে যেখানে ডলারের দাম ছিল ৮৪ টাকা ৯৫ পয়সা, ২০২২ সালের মাঝামাঝি এসে তা এক লাফে ১০০ টাকা অতিক্রম করে। বাজারে তখন কার্যত ১২০–১৩০ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে ডলার ছিল ১১৮ টাকার ঘরে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে ডলারের দাম ১২২–১২৩ টাকার মধ্যে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থপাচার রোধ ও হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ সঠিক পথে আছে। তবে কেবল প্রশাসনিক কড়াকড়ি নয়, দীর্ঘমেয়াদে রফতানি পণ্যের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা বাড়ানো, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরতা কমানো ছাড়া ডলার স্থিতিশীল রাখা যাবে না। নীতিনির্ধারকরা এখনই সঠিক কৌশল না নিলে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবারও ঘাটতি ফিরে আসতে পারে। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/২৬ আগস্ট, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 6 months আগে

