অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
থামছে না ব্যাংক ঋণের পুনঃতফশিল। চলতি বছরের প্রথম ৩ মাসে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ পুনঃতফশিল করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
অথচ পুনঃতফশিল মানেই খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল করা। এই ফর্মুলার ফাঁদে ফেলে ঋণখেলাপিদের এক ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাপি ঋণ কম দেখানোর যে কয়েকটি হাতিয়ার আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো ঋণ পুনঃতফশিল। এতে সাময়িক খেলাপি ঋণ কম দেখালেও দীর্ঘমেয়াদে এসব ঋণ আর খুব বেশি ভালো হতে দেখা যায় না। ধীরে ধীরে পুনঃতফশিল করা এসব ঋণ আবারও খেলাপিতে রূপান্তরিত হয়।
তারা বলছেন, ঋণ আদায়ে শক্ত ব্যবস্থা না নিয়ে একের পর এক ছাড় দেওয়ার কারণে কার্যত খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৩ সালে জানুয়ারি-মার্চ সময়ে ৩ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফশিল করা হয়। এর বিপরীতে ৫৮ কোটি ২৩ লাখ টাকার সুদ মওকুফ করেছে ব্যাংকগুলো।
ডলার সংকটের এ সময়ে আইএমএফ থেকে সরকার যে ঋণ নিচ্ছে তার অন্যতম শর্ত খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। তবে আদায়ে কঠোরতার পরিবর্তে পুনঃতফশিলের শর্ত শিথিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমানোর চেষ্টা করছে। এ ধরনের উদ্যোগ আগেও বিভিন্ন সময়ে নেওয়া হয়। এতে সাময়িকভাবে কিছু ঋণ আদায় হলেও পরে খেলাপি হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে অনেক আগে থেকেই খেলাপি ঋণ পুনঃতফশিল করতে পারে ব্যাংকগুলো। তবে শর্ত শিথিল করে গত বছরের ১৮ জুলাই নতুন নীতিমালা জারি করা হয়। নতুন নীতিমালায় ডাউন পেমেন্টের হার কমিয়ে বকেয়ার আড়াই থেকে ৩ শতাংশ করা হয়। আগে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ডাউন পেমেন্ট বা এককালীন জমা দিতে হতো। আবার আগে কোনো ঋণ একবারে সর্বোচ্চ ৩ বছরের জন্য পুনঃতফশিল করা যেত। এখন ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ প্রথম দুই দফা ৮ বছর করে ১৬ বছর, তৃতীয় দফায় ৭ বছর এবং চতুর্থ দফায় ৬ বছরের জন্য পুনঃতফশিল করা যাবে।
এভাবে পুনঃতফশিলের পর নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘সমঝোতার অঙ্ক’ জমা দেওয়ার শর্তও শিথিল করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২২ সালের শেষ ৩ মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নীতিমালার আলোকে সবচেয়ে বেশি ঋণ পুনঃতফশিল হয়েছে। অক্টোবর-ডিসেম্বরের সে সময়ে পুনঃতফশিল করা হয় ১৭ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ১ হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা সুদ মওকুফ করেছে ব্যাংকগুলো।
এর আগের ৩ মাসে ৫ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা পুনঃতফশিল করা হয়, যার বিপরীতে সুদ মওকুফের অঙ্ক ছিল ৩৫১ কোটি টাকা। আর ২০২১ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে ৬ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা পুনঃতফশিল করা হয়। এর বিপরীতে সুদ মওকুফ করা হয় ১ হাজার ৫১ কোটি টাকা।
করোনার কারণে ২০২০ সালে কোনো ঋণগ্রহীতা কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাকে খেলাপি করা হয়নি। ২০২১ সালে যে পরিমাণ পরিশোধ করার কথা ১৫ শতাংশ দিলেও খেলাপিমুক্ত থাকা গেছে। গত বছর কিস্তির ৫০ শতাংশ দিলে খেলাপি করা হয়নি।
এ বছরও কিস্তির অর্ধেক দিলে খেলাপি করা হবে না। তবে এর আগে ২০১৯ সালে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১২ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফশিলের সুযোগ দেওয়া হয়। ওই বছর ৫২ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ পুনঃতফশিল হয়। তার আগে বিশেষ সুবিধায় পুনর্গঠন বা পুনঃতফশিল করা হয়। গত ১০ বছরে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়মিত করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে বছরের পর বছর শিথিলতা দেখানো হয়। এতে কোনো কাজ হয়নি। সর্বশেষ কয়েকদিন আগেও ঋণখেলাপিদের ছাড় দেওয়া হলো। এর আগে যারাই বিশেষ সুবিধায় ঋণ পুনঃতফশিল বা পুনর্গঠন সুবিধা নিয়েছেন, পরবর্তী সময়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের ঋণ আবার খেলাপি হয়েছে। ফলে এখন কঠোর হওয়ার সময় এসেছে। আইএমএফ’র ঋণ কর্মসূচির কারণে এখনই কঠোর হওয়ার উপযুক্ত সময়।
কেননা তারা চলতি বছরের মধ্যে সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন ও নতুন কর আইন পাশ করে আগামী বছর থেকে বাস্তবায়নের শর্ত দিয়েছে। তিনি বলেন, সে আইন তো পাশ হচ্ছে বা হবে। কাঠামোগত পরিবর্তনের এই আইন ব্যাংক খাতকে আরও দুর্বল করল কিনা সেটা ভেবে দেখতে হবে।
ডলার সংকট কাটাতে আইএমএফ’র ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের প্রথম কিস্তি পেয়েছে বাংলাদেশ। আরও ৬ কিস্তিতে বাকি অর্থ ছাড় হবে। প্রতি পর্যায়ে বিভিন্ন শর্ত পরিপালন দেখে ঋণ ছাড় করবে সংস্থাটি। আইএমএফ ঋণের অন্যতম শর্ত রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে এবং বেসরকারি ব্যাংকের ৫ শতাংশের নিচে নামাতে হবে।
অকা/ব্যাংখা/সকাল, ২৫ জুন, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 3 years আগে

