অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

দেশের পুঁজিবাজারে আবারও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা বাড়তে শুরু করেছে। দীর্ঘ সময় তুলনামূলক ধীরগতির পর সাম্প্রতিক সময়ে তারা আবার নির্বাচিত কিছু শক্তিশালী কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন। বিশেষ করে ব্যাংক ও ওষুধ খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)–এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগে নতুন গতি দেখা গেছে। বাজারের বড় ও স্থিতিশীল কোম্পানিগুলোকে কেন্দ্র করেই এই বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ওষুধ ও ব্যাংকিং খাতে।

ওষুধ খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস-এ ফেব্রুয়ারি মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ১৬০ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন। এর ফলে কোম্পানিটিতে বিদেশিদের অংশীদারিত্ব প্রায় ১৪.৭০ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫.৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্থিতিশীল আর্থিক অবস্থা, ধারাবাহিক মুনাফা এবং শক্তিশালী কর্পোরেট সুনামের কারণে এই কোম্পানিটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই আকর্ষণীয়।

ব্যাংক খাতেও বিদেশিদের আগ্রহ দেখা গেছে। বিশেষ করে ব্র্যাক ব্যাংক-এর শেয়ারে ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ১১০ কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকটিতে বিদেশি অংশীদারিত্ব ৩৬.০৫ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৩৬.৭২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিতে শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা কাঠামো ও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা এই ব্যাংকটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

এছাড়া আরও কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তুলনামূলক ছোট পরিসরে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক এবং আইডিএলসি ফাইন্যান্স। সব মিলিয়ে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রায় ২৬টি কোম্পানিতে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়ে মোট প্রায় ২৮০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

তবে একই সময়ে কিছু বড় প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিদেশিরা বিক্রিও করেছেন। সবচেয়ে বড় বিক্রি হয়েছে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ-এ। এই কোম্পানির প্রায় ৮০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশীদারিত্ব প্রায় ৩২.৮৩ শতাংশ থেকে কমে ৩০.২৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

টেলিকম খাতের শীর্ষ কোম্পানি গ্রামীণফোন-এর ক্ষেত্রেও কিছু শেয়ার বিক্রির ঘটনা ঘটেছে। ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ২৫ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করায় কোম্পানিটিতে বিদেশি অংশীদারিত্ব ০.৬৭ শতাংশ থেকে কমে ০.৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ডিবিএইচ ফাইন্যান্স, বিসিআরএম লিমিটেড এবং যমুনা অয়েল কোম্পানি-সহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার থেকেও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কিছুটা সরে এসেছেন। মোট ১৬টি কোম্পানিতে বিদেশি শেয়ার বিক্রির পরিমাণ প্রায় ১২৬ কোটি টাকার বেশি।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত। বর্তমানে প্রায় ৩৬০টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১৩২টির শেয়ারে বিদেশি অংশীদারিত্ব রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিদেশি অংশীদারিত্ব রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকে, যা প্রায় ৩৬ শতাংশের কাছাকাছি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, যেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশ প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি, স্বচ্ছ কর্পোরেট ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে—এমন কোম্পানিতেই বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন। কিন্তু দেশের পুঁজিবাজারে এখনও অনেক দুর্বল বা কর্পোরেট শাসনের ঘাটতিপূর্ণ কোম্পানি রয়েছে, যার কারণে বিদেশি বিনিয়োগের বিস্তৃত সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

এছাড়া কর কাঠামোর জটিলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং কর্পোরেট গভর্ন্যান্স নিয়ে উদ্বেগও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মূলধন পুনঃরপ্তানির প্রক্রিয়া সহজ করতে কিছু নিয়ম শিথিল করেছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগে যেখানে সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুমোদন ছাড়াই মূলধন স্থানান্তর করতে পারতেন, এখন সেই সীমা বাড়িয়ে ১০০ কোটি টাকা করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। কারণ এতে তারা প্রয়োজনে সহজে তাদের বিনিয়োগ করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে নিতে পারবেন, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি তহবিল আকর্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

অকা/পুঁবা/ই/দুপুর/১৫ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 5 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version