অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্পষ্ট গতিমন্থরতা বিরাজ করলেও চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে ভ্যাট আদায়ে খাতভেদে বৈপরীত্যপূর্ণ চিত্র দেখা যাচ্ছে। তামাক ও বেভারেজের মতো নির্দিষ্ট কয়েকটি বড় খাতে ভ্যাট আদায়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হলেও ব্যাংক, মোবাইল ফোন, কনস্ট্রাকশন মেটেরিয়াল ও ভোক্তা পণ্য খাতে সেই গতি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। এমনকি সিমেন্ট খাতে ভ্যাট আদায় উল্টো কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ভ্যাট আদায়ের এই প্রবৃদ্ধি হিসাব করা হয়েছে আগের অর্থবছর ২০২৪–২৫-এর একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করে। ওই সময় দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণঅভ্যুত্থানের প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ায় রাজস্ব আদায়ের ভিত্তি ছিল তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ফলে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশ ‘লো বেস ইফেক্ট’-এর ফল। তবে অর্থনীতিতে স্বাভাবিক গতি থাকলে প্রায় সব খাতেই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা যাওয়ার কথা ছিল—যা বাস্তবে হয়নি।
এনবিআরের লার্জ ট্যাক্সপেয়ার্স ইউনিট–ভ্যাট (এলটিইউ-ভ্যাট) অফিসের আওতাধীন ১০৯টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ভ্যাট আদায় বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ। মোট প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট আদায়ের মধ্যে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি এসেছে এই সীমিত সংখ্যক বড় প্রতিষ্ঠান থেকে। লক্ষণীয় হলো, এই আয়ের অর্ধেকেরও বেশি এসেছে মাত্র তিনটি তামাক কোম্পানি থেকে, যা কার্যত রাজস্ব আয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি তৈরি করছে।
তামাক খাতে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ভ্যাট আদায় হয়েছে ২১ হাজার ২৩১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি। অথচ একই সময়ে বাজারে সিগারেট বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈপরীত্যের মূল কারণ হলো ২০২৫ সালের শুরুতে তামাকজাত পণ্যের দাম ও সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি এবং নীতিগত কিছু পরিবর্তন। অর্থাৎ রাজস্ব বেড়েছে মূলত কর বৃদ্ধির কারণে, উৎপাদন বা ভোগ বৃদ্ধির কারণে নয়। বেভারেজ খাতেও প্রায় একই কারণে ভ্যাট আদায়ে ৩৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে ভ্যাট আদায় বেড়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই-ডিসেম্বর সময়টি সাধারণত ওষুধ শিল্পের জন্য মৌসুমি ভালো সময় হলেও এই প্রবৃদ্ধি সারা বছর ধরে টিকে থাকবে—এমন সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে সিমেন্ট খাতে গত দেড় বছর ধরে চাহিদা কমে যাওয়ায় ভ্যাট আদায়ে প্রায় ২০ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রমের স্থবিরতার প্রতিফলন।
ব্যাংক খাত থেকে ভ্যাট আদায় বেড়েছে মাত্র ৩.৪৬ শতাংশ। কয়েকটি ব্যাংকের কার্যক্রম সীমিত হয়ে যাওয়া, আমানত হ্রাস এবং আর্থিক খাতে আস্থার সংকট—সব মিলিয়ে এই দুর্বল প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির চাপকেই স্পষ্ট করছে। ব্যাংকার ও বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও একটি সুশৃঙ্খল ক্ষমতা হস্তান্তর ছাড়া অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও ভোগ—কোনোটিতেই গতি ফিরবে না।
সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের ভ্যাট আদায়ের চিত্র দেখায়, রাজস্ব বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে করহার ও নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারের মাধ্যমে নয়। ফলে এই প্রবৃদ্ধি স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি দিলেও, অর্থনীতিতে প্রকৃত গতি না ফিরলে তা টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা সীমিতই থেকে যাচ্ছে। ●
অকা/রা/ই/সকাল/৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 1 day আগে

