অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

দেশের অন্যতম বড় পাইকারি ভোগ্যপণ্যের বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ-এ সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসব পণ্যের বেশিরভাগই যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরুর অনেক আগেই দেশে আমদানি করা হয়েছিল এবং বাজারে পর্যাপ্ত মজুতও রয়েছে। তবুও অল্প সময়ের ব্যবধানে দাম বাড়ায় ভোক্তা ও বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—এই মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত কারণ কী।

বাজারসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির খবর প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই পাইকারি বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। যদিও আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাস্তবিক কোনো প্রভাব পড়ার মতো সময় এখনো আসেনি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, লাতিন আমেরিকা থেকে সয়াবিন তেলবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে সাধারণত প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগে। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে স্থানীয় বাজারে এর সরাসরি প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও কাস্টমস সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে দেশে প্রায় ৪ লাখ ৬৩ হাজার টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে। তবুও যুদ্ধ পরিস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর খাতুনগঞ্জে সয়াবিন তেলের মণপ্রতি দাম প্রায় ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। একই সঙ্গে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের খুচরা বাজারেও সয়াবিন তেলের সাময়িক সংকটের অভিযোগ উঠেছে।

শুধু সয়াবিন নয়, পাম অয়েলের দামেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। পাম অয়েল মূলত মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করা হয় এবং এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তবুও খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে পাম অয়েলের মণপ্রতি দাম প্রায় ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কাস্টমসের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে দেশে প্রায় ১০ লাখ ৩৮ হাজার টন পাম অয়েল আমদানি হয়েছে, যা বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইতোমধ্যে দেশে থাকা পণ্যের ক্ষেত্রে যুদ্ধের অজুহাতে দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটলেও তার প্রভাব স্থানীয় বাজারে পৌঁছাতে সাধারণত দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে। তাই দ্রুত মূল্যবৃদ্ধির পেছনে অসাধু ব্যবসায়ী ও বাজার কারসাজির বিষয়টি সামনে আসছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এর অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. নঈম উদ্দিন হাছান আওরঙ্গজেব বলেন, সরকার এখনো জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচের কারণে অন্য পণ্যে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধের কারণে দ্রব্যমূল্য বাড়ার মতো বাস্তব অবস্থা তৈরি হয়নি। তাঁর মতে, মূলত কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ নিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন।

খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১ মার্চ পর্যন্ত খোলা পরিশোধিত পাম অয়েলের মণপ্রতি দাম ছিল প্রায় ৫ হাজার ৯০০ টাকা। মধ্যপ্রাচ্যে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তা বেড়ে প্রায় ৬ হাজার টাকায় পৌঁছে যায়। পরদিন কিছুটা কমলেও পরে আবার প্রায় ২০০ টাকা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে লেনদেন হচ্ছে।

একইভাবে গমের দামও বেড়েছে। আগে যেখানে গমের মণপ্রতি দাম প্রায় ১ হাজার ১৫০ টাকার মধ্যে ছিল, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকায় উঠেছে। খোলা সয়াবিন তেলের মণপ্রতি দাম ১২০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়ে ৭ হাজার ১৮০ থেকে ৮ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।

চিনির দামও বেড়েছে। বর্তমানে চিনির মণপ্রতি দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকা বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ৪৭০ থেকে ৩ হাজার ৪৮০ টাকার মধ্যে লেনদেন হচ্ছে। এছাড়া সুপার অয়েলের দাম প্রায় ২০০ টাকা বেড়ে ৬ হাজার ৪০০ টাকায় পৌঁছেছে।

বাজারে আরও কিছু পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ড্রাম বিটুমিনের দাম বেড়ে ১৫ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগে ছিল প্রায় ১২ হাজার টাকা। কিসমিসের দাম কেজিপ্রতি ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকায় উঠেছে, যা মানভেদে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত বেশি।

সবচেয়ে বেশি বেড়েছে টক আলুর দাম। আগে যেখানে মণপ্রতি দাম ছিল প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা ডাল ও শুকনো খাদ্যপণ্যের দামেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

বর্তমানে মসলা বাজারেও দামের ঊর্ধ্বগতি রয়েছে। জিরা কেজিপ্রতি ৫৭০ থেকে ৫৮০ টাকা, এলাচ ৪ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা, দারুচিনি ৩৫৫ থেকে ৪৫০ টাকা এবং লবঙ্গ ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গোলমরিচ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০ থেকে ১ হাজার ৪০ টাকায়।

অন্যদিকে জায়ফল কেজিপ্রতি প্রায় ৭২০ টাকা এবং জয়ত্রী ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আদা কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১১০ টাকা এবং পেঁয়াজ মানভেদে ২৫ থেকে ৫২ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। চায়না রসুন কেজিপ্রতি প্রায় ২০০ টাকা এবং দেশি রসুন প্রায় ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ব্যবসায়ীরা প্রায়ই দাম বাড়ানোর জন্য একটি ইস্যু খোঁজেন। যুদ্ধ পরিস্থিতি তাদের জন্য একটি অজুহাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাস্তবে যুদ্ধের প্রভাব এত দ্রুত বাজারে পড়ার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি না থাকায় কিছু ব্যবসায়ী পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছেন।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যদি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দাম বাড়তে পারে, যার প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও পড়বে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়া মূলত বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর সুযোগ নেওয়ার ফল বলেই মনে করছেন তারা।

অকা/প্র/ই/সকাল/৯ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 12 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version