শিপন হালদার> 

বাংলাদেশের আদালতগুলোতে মামলার পাহাড় জমে আছে। নতুন মামলাও হচ্ছে প্রতিদিন। কিন্তু নিষ্পত্তির গতি সেই তুলনায় অনেক ধীর। ফলে একজন সাধারণ মানুষকে একটি মামলার রায় পেতে অনেক সময় বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। এই দীর্ঘ অপেক্ষা শুধু বিচারপ্রার্থী মানুষের জন্য নয়, দেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশের জন্যও বড় বাধা। আর ন্যায়বিচার, মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগতো রয়েছেই।  

এমন বাস্তবতায় মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, এই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এক বছরের মধ্যে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৪৫ লাখ থেকে ২০ লাখে নামিয়ে আনা সম্ভব। সংখ্যাটি উচ্চাভিলাষী মনে হতে পারে, তবে এর পেছনে যে যুক্তি রয়েছে, তা একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

সরকারের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে ইতোমধ্যে ইতিবাচক ফল মিলেছে। পারিবারিক বিরোধ, সম্পত্তি বণ্টন, ভাড়াসংক্রান্ত বিরোধ, যৌতুক এবং ভরণপোষণের মতো মামলায় আদালতে যাওয়ার আগেই অনেক বিরোধ মীমাংসা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, কিছু ক্ষেত্রে মামলার সংখ্যা ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এটি দেখায়, অনেক বিরোধ আদালতের রায় নয়, আলোচনার মাধ্যমেও সমাধান করা সম্ভব।

আসলে আদালত সব সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়। প্রতিবেশীর সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ, স্বামী-স্ত্রীর পারিবারিক বিরোধ, উত্তরাধিকার নিয়ে মতবিরোধ কিংবা বাড়িভাড়ার মতো অনেক বিষয় আলোচনার মাধ্যমে মিটে যেতে পারে। এতে দুই পক্ষের সম্পর্কও পুরোপুরি নষ্ট হয় না, আবার সময় ও অর্থ—দুটোই বাঁচে।

তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মনে রাখতে হবে। মধ্যস্থতা যেন ন্যায়বিচারের বিকল্প না হয়ে ওঠে। সব মামলা আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির উপযুক্ত নয়। নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতি কিংবা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে আইনের পূর্ণাঙ্গ বিচারই হতে হবে। দ্রুত মামলা কমানোর লক্ষ্য কখনোই ন্যায়বিচারের সঙ্গে আপস করার কারণ হতে পারে না।

মধ্যস্থতা সফল করতে হলে আরও কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রথমত, দক্ষ ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসগুলোকে আরও কার্যকর করতে হবে। তৃতীয়ত, বিচারক, আইনজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এই পদ্ধতি সম্পর্কে আস্থা তৈরি করতে হবে। কারণ মানুষ যদি বিশ্বাসই না করেন যে মধ্যস্থতায় ন্যায্য সমাধান পাওয়া সম্ভব, তাহলে এই উদ্যোগ সফল হবে না।

মামলার জটের আরেকটি বড় কারণ বিচারকের স্বল্পতা। বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখ মানুষের বিপরীতে বিচারকের সংখ্যা এখনও অনেক উন্নত দেশের তুলনায় কম। তাই শুধু মধ্যস্থতা চালু করলেই সমস্যার পুরো সমাধান হবে না। নতুন বিচারক নিয়োগ, আদালতের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, ই-ফাইলিং, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শুনানি শেষ করা এবং অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণ কমানোর মতো সংস্কারও সমান জরুরি।

একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থা শুধু আদালতের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতিরও ভিত্তি। ব্যবসায়িক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি হলে বিনিয়োগ বাড়ে, উদ্যোক্তাদের আস্থা তৈরি হয় এবং অর্থনীতির গতি বাড়ে। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায়ও দেখা গেছে, যেসব দেশে বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, সেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ তুলনামূলক ভালো থাকে। একইভাবে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিকে সহজলভ্য বিচার নিশ্চিত করার একটি কার্যকর উপায় হিসেবে উল্লেখ করেছে।

সরকারের নতুন উদ্যোগ তাই ইতিবাচক। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগের ওপর। শুধু উদ্বোধন বা ঘোষণা দিয়ে নয়, মাঠপর্যায়ে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলেই এই উদ্যোগ মানুষের আস্থা অর্জন করবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বিচার মানে শুধু আদালতের রায় নয়; বিচার মানে সময়মতো ন্যায়বিচার। যদি একটি বিরোধ আদালতের বাইরে, আইনের কাঠামোর মধ্যেই দ্রুত ও ন্যায্যভাবে মিটে যায়, তাহলে সেটিও বিচার। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া হতে হবে স্বেচ্ছাসম্মত, নিরপেক্ষ এবং আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাহলেই মামলার জট কমবে, মানুষের ভোগান্তি কমবে এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও শক্তিশালী হবে। আমরা আশা করবো, সরকার বাস্তব প্রয়োগের দিকেই এগোবে। আমরা সুশাসনে সুদিনের প্রত্যাশায় রইলাম। 

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক, সেভ ফাউন্ডেশন। 

সর্বশেষ হালনাগাদ 12 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version