অর্থকাগজ প্রতিবেদন
রাজস্ব আদায়ে ধারাবাহিক ঘাটতি, প্রত্যাশিত বৈদেশিক সহায়তা না পাওয়া এবং নির্বাচনসহ বিভিন্ন জরুরি ব্যয় মেটানোর চাপ—এই তিনটি কারণ একত্রে সরকারকে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি নির্ভরশীল করে তুলেছে। এর সরাসরি ফল হিসেবে দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের স্থিতি বেড়েছে ১ লাখ ৫১ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা। গত বছরের জানুয়ারিতে যেখানে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ৪২ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা, সেখানে চলতি বছরের জানুয়ারি শেষে তা দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৯৪ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, ঋণের এই দ্রুত বৃদ্ধি সরকারের অর্থায়ন কাঠামোয় বড় ধরনের চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসেই (জুলাই-জানুয়ারি) অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে নেওয়া ৪০ হাজার ১৪৪ কোটি টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই প্রবণতা স্পষ্ট করে যে, সরকারের ব্যয় নির্বাহে অভ্যন্তরীণ ধার এখন প্রধান ভরসায় পরিণত হয়েছে।
ঋণের উৎস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নিয়েছে ৬৪ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা, যেখানে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস—যেমন সঞ্চয়পত্র, বীমা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান—থেকে এসেছে মাত্র ৭ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে চিত্র ছিল ভিন্ন; তখন ব্যাংকের চেয়ে বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছিল ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে। এই পরিবর্তন ইঙ্গিত দেয় যে, সরকার এখন দ্রুত নগদ প্রবাহের জন্য ব্যাংকিং খাতকেই বেশি ব্যবহার করছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনুষ্ঠিত নির্বাচন, নতুন ব্যাংকে বিনিয়োগ এবং প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়। কিন্তু রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হওয়ায় সেই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ঋণের পথই প্রধান বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর ফলে ঋণের চাপ দ্রুত স্ফীত হয়েছে।
বাংলাদেশের বাজেট কাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই ঘাটতিনির্ভর। চলতি অর্থবছরের বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে (অনুদানসহ) ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৩.৫ শতাংশ। অনুদান বাদ দিলে এই ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা বা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। এই ঘাটতি অর্থায়নের জন্য সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করলেও বাস্তবে সেই সীমা ইতোমধ্যেই অতিক্রম করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের মার্চের শেষ নাগাদ সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মোট ১ লাখ ৬ হাজার ৫১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে—যা পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি বা কিছু ক্ষেত্রে তা ছাড়িয়ে গেছে, অথচ অর্থবছরের এখনো কয়েক মাস বাকি। এতে বোঝা যায়, ব্যয়ের চাপ অনুমানের চেয়েও বেশি ছিল।
সামগ্রিক চিত্রে দেখা যায়, ব্যাংক খাত থেকে সরকারের পুঞ্জীভূত ঋণ ইতোমধ্যে ৬ লাখ ১০ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মার্চ শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকায়। অন্যদিকে ব্যাংকবহির্ভূত খাতে এই ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের বড় অংশ এখন ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
এদিকে বৈদেশিক ঋণের দিক থেকেও চাপ কম নয়। গত জুন পর্যন্ত সরকারের বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ৪৯ হাজার ১১ কোটি টাকা। আর ডিসেম্বর শেষে তা ডলারে হিসাব করলে দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন, যা টাকায় প্রায় ১৩ লাখ ৯২ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকার সমান (প্রতি ডলার ১২২.৭০ টাকা হিসেবে)।
সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, সরকারের অর্থায়ন কাঠামো ক্রমেই অভ্যন্তরীণ ঋণ—বিশেষ করে ব্যাংকনির্ভর ঋণের দিকে ঝুঁকছে। এই প্রবণতা স্বল্পমেয়াদে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়া, সুদের হার বৃদ্ধির চাপ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতায় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যয় দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং বৈদেশিক অর্থায়নের ভারসাম্য পুনর্গঠন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 6 hours আগে

