কামরুজ্জামান চাঁদ>
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের বর্তমান চিত্র একদিকে যেমন কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি গভীর উদ্বেগও তৈরি করছে। সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো প্রবাসী আয়ের রেকর্ড প্রবাহ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে এসেছে ৩৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। এই অর্থপ্রবাহের কারণে চলতি হিসাবের ঘাটতি কমেছে এবং বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২৬ সালের জুন শেষে প্রায় ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
কিন্তু এই ইতিবাচক চিত্রের আড়ালে লুকিয়ে আছে অর্থনীতির আরেকটি বাস্তবতা। উৎপাদন ও বাণিজ্যের মূল সূচকগুলো আশাব্যঞ্জক নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলসির মাধ্যমে আমদানি দায় পরিশোধ হয়েছে ৭০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় মাত্র ০.০৯ শতাংশ বেশি। এই পরিসংখ্যান প্রথম দেখায় স্থিতিশীল মনে হলেও অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শিল্প খাতের মন্থরতারই প্রতিফলন। কারণ কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি না বাড়লে নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন সম্প্রসারণও থমকে যায়।
রফতানি খাতের অবস্থাও খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়। বিদায়ী অর্থবছরে দেশের মোট পণ্য রফতানি হয়েছে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ০.৫৮ শতাংশ কম। অথচ সরকারের লক্ষ্য ছিল ৫৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পও আন্তর্জাতিক বাজারের দুর্বল চাহিদা, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং লজিস্টিক ব্যয়ের চাপে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাণিজ্য ভারসাম্যে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) দেশের আমদানি হয়েছে ৬৪.০২ বিলিয়ন ডলার, আর রফতানি হয়েছে ৪০.০৪ বিলিয়ন ডলার। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩.৯৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি। এই ব্যবধান কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি অর্থনীতির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, উৎপাদন কাঠামো এবং বৈদেশিক লেনদেনের দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি।
অবশ্য রেমিট্যান্সের শক্ত অবস্থান আপাতত এই চাপ সামাল দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি অর্থনীতি কতদিন শুধু প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করে এগোতে পারে? বৈশ্বিক শ্রমবাজারে পরিবর্তন, মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কিংবা অভিবাসন নীতির পরিবর্তন হলে রেমিট্যান্সেও ধাক্কা লাগতে পারে। তখন পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
এ কারণেই এখন প্রয়োজন উৎপাদন ও রফতানির ভিত্তিকে শক্তিশালী করা। নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, শিল্পে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যবসার ব্যয় কমানো এবং রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য, আইসিটি এবং হালকা প্রকৌশলসহ সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে এগিয়ে নিতে হবে।
সরকারের ফ্রি ট্রেড জোন (এফটিজেড) চালুর উদ্যোগ এই প্রেক্ষাপটে ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে। নতুন নীতিমালার আওতায় ব্যবসায়ীরা এলসি ছাড়াই চালানভিত্তিক কাঁচামাল আমদানি, শুল্কমুক্ত সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রিপ্যাকেজিং এবং পুনঃরফতানির সুযোগ পাবেন। এসব সুবিধা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, সরবরাহ ব্যবস্থা আরও দক্ষ হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা বাড়বে।
তবে নীতিমালা প্রণয়নই শেষ কথা নয়। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বিনিয়োগ ছাড়া উৎপাদন বাড়বে না, উৎপাদন না বাড়লে রফতানিও বাড়বে না।
বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রেমিট্যান্স অর্থনীতিকে স্বস্তি দিচ্ছে, অন্যদিকে আমদানি-রফতানির ধীরগতি ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা দিচ্ছে। সাময়িক স্বস্তির আড়ালে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি উপেক্ষা করলে চলবে না। এখনই উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রফতানিকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্য ফিরবে, অর্থনীতি হবে আরও শক্তিশালী ও টেকসই।
লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, অর্থকাগজ।
সর্বশেষ হালনাগাদ 14 hours আগে

