অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার বছর পর দেশের ব্যাংকিং খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি আবারও দুই অংকের ঘরে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বার্ষিক আমানত প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ১০ শতাংশ, যা গত ৫০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। সর্বশেষ ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে এই হার ছিল ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ। এরপর ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি কমতে থাকে; একপর্যায়ে টানা ১৭ মাস তা এক অংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ২০২৫ সালের আগস্টে আবার দুই অংকে ফেরার পর ডিসেম্বরের তথ্য সেই পুনরুদ্ধারকে আরও শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক আমানতের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এই পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে নিট আমানত বৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, যা সাম্প্রতিক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নির্দেশ করে।
এই প্রবৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশে এসেছে ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ মাসিক রেমিট্যান্স প্রাপ্তি। আগের বছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ২ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৫৮০ মিলিয়ন ডলার বেশি এসেছে। রেমিট্যান্সের এই বাড়তি প্রবাহ সরাসরি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় জমা হয়েছে, কারণ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো অর্থ দেশে এসে স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তরিত হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা আমানত হিসেবে হিসাবভুক্ত হয়।
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহে একটি দৃশ্যমান গতি তৈরি হয়। হুন্ডি নির্ভর অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি, প্রণোদনা কাঠামোর কার্যকারিতা এবং বিনিময় হার ব্যবস্থায় তুলনামূলক বাস্তবসম্মত সমন্বয়—এসব মিলিয়ে আনুষ্ঠানিক মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বাড়ে। এর ফলে ব্যাংকের আমানতভিত্তি সম্প্রসারিত হতে শুরু করে।
অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র কিন্তু পুরোপুরি অনুকূল ছিল না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্বের হার বৃদ্ধি, প্রত্যাশিত রফতানি আয় না পাওয়া এবং বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি মন্থর থাকা—এসব উপাদান সাধারণত সঞ্চয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। বাস্তবে অনেক পরিবারের প্রকৃত আয় (real income) মূল্যস্ফীতির কারণে সংকুচিত হয়েছে। তবুও আমানত বেড়েছে—এটি আপাতদৃষ্টিতে বৈপরীত্য মনে হলেও এর পেছনে কাঠামোগত ব্যাখ্যা রয়েছে।
প্রথমত, প্রবাসী আয়ের একটি বড় অংশ গ্রামীণ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে প্রবাহিত হয়েছে, যারা তাৎক্ষণিক ভোগ ব্যয়ের পাশাপাশি একটি অংশ ব্যাংকে জমা রেখেছে। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় দীর্ঘদিনের ৯-৬ সুদনীতি থেকে সরে আসে। ওই নীতির অধীনে আমানতের সুদহার ছিল সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ এবং ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ। বাজারভিত্তিক সুদহার কার্যকর হওয়ার পর ব্যাংকগুলো আমানতে প্রতিযোগিতামূলক হার দিতে শুরু করে। বর্তমানে অনেক ব্যাংক ৯ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে, যা সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির হারের সমান বা কিছু ক্ষেত্রে বেশি। ফলে আমানতকারীরা প্রকৃত অর্থে ইতিবাচক রিটার্নের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন।
একই সময়ে বিকল্প বিনিয়োগ ক্ষেত্রগুলোতেও অনিশ্চয়তা ছিল। শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা অনুপস্থিত, রিয়েল এস্টেট খাতে লেনদেন মন্থর এবং ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার আগের তুলনায় কিছুটা নিম্নমুখী। ফলে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ ঝুঁকি এড়িয়ে তুলনামূলক নিরাপদ ও তরল বিনিয়োগ হিসেবে ব্যাংক আমানতকে বেছে নিয়েছে। এই আচরণগত পরিবর্তনও আমানত প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে।
তবে এই প্রবৃদ্ধি কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর। রেমিট্যান্স প্রবাহ অব্যাহত থাকবে কি না, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে কি না এবং বেসরকারি খাতে ঋণচাহিদা পুনরুদ্ধার হবে কি না—এসবই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ গতিপথ। আমানত দ্রুত বাড়লেও যদি ঋণ বিতরণ সমানতালে না বাড়ে, তাহলে ব্যাংকগুলোর নিট সুদ মার্জিনে চাপ তৈরি হতে পারে। আবার ঋণ দ্রুত বাড়াতে গিয়ে যদি ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ সৃষ্টি হয়, তবে তা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ ডেকে আনতে পারে।
সার্বিকভাবে, ৫০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ আমানত প্রবৃদ্ধি ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হলেও এটি কেবল তারল্য বৃদ্ধির গল্প নয়। এটি প্রবাসী আয়ের প্রবণতা, সুদনীতি পরিবর্তন, বিনিয়োগ আচরণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার সমন্বিত প্রতিফলন। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—এই বাড়তি সঞ্চয়কে কীভাবে উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করা যায়। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 10 hours আগে

