অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বাংলাদেশের শেয়ার বাজারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক নতুন বাস্তবতা—রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বাজারের গতি এখন পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাজনৈতিক আস্থাহীনতা, অর্থনৈতিক চাপ, আর্থিক খাতে নানা অনিশ্চয়তা ও সামগ্রিক স্থবিরতা বিনিয়োগকারীদের মনোভাবকে সংযত করে রেখেছিল। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে কিছুটা পূর্বানুমেয় হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়ার পর বাজারে ধীরে ধীরে আস্থার আভাস দেখা যাচ্ছে, যা শেয়ার বাজারের গতিতেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট চিত্র মিলেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে। সূচক ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে এবং বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক বাজার বিশ্লেষকের মতে, নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রত্যাশা ও স্থিতিশীলতার আশাই এই গতিশীলতার অন্যতম চালিকাশক্তি।
তবে এই স্বল্পমেয়াদি উত্থান বুঝতে হলে পেছনের দীর্ঘ সংকটের বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের শেয়ার বাজার কাঠামোগত নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। নতুন আইপিওর ঘাটতি, মানসম্মত কোম্পানির তালিকাভুক্তি কমে যাওয়া, কার্যকর তদারকি ও নীতি সংস্কারের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে বাজারে টেকসই প্রাণ ফেরানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। এর ফলে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক যেকোনো নেতিবাচক সংকেত বাজারকে সহজেই নীচের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত ঝুঁকি কমাতে শেয়ার বিক্রির পথে হাঁটেন। সামাজিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হলে স্বল্পমেয়াদি পুঁজি বাজার ছাড়ে এবং সূচকে চাপ তৈরি হয়। কিন্তু নির্বাচনের সময়সূচি স্পষ্ট হওয়ার পর সেই অনিশ্চয়তার জায়গায় কিছুটা প্রত্যাশা জন্ম নিয়েছে, যা সাম্প্রতিক বুলিশ মনোভাবের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
স্বল্পমেয়াদি দৃষ্টিতে দেখলে, এই প্রেক্ষাপটে কিছু সুযোগ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশায় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ আবার বাজারে সক্রিয় হচ্ছেন। উন্নয়নশীল শেয়ার বাজারে এটি একটি পরিচিত প্রবণতা—অনেকে ধারণা করেন, নতুন সরকার বাজারবান্ধব নীতি গ্রহণ করলে দীর্ঘমেয়াদে শেয়ার বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। এই আশাবাদ থেকেই বড় মূলধনি শেয়ার ও ব্যাংকিং খাত তুলনামূলকভাবে বেশি আকর্ষণ সৃষ্টি করছে।
তবে এই আশাবাদের পাশাপাশি ঝুঁকিগুলোও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা বা সহিংসতা দেখা দিলে বাজারের এই ভঙ্গুর আস্থা দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা লাভের চিন্তার চেয়ে মূলধন রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেন, যা সূচকে তীব্র পতন ডেকে আনতে পারে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ এখনও দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করতে পারেনি। অনেক বড় বিনিয়োগকারী এখনো ভোটের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন, যা বাজারের জন্য একটি স্পষ্ট ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। পাশাপাশি নির্বাচনকেন্দ্রিক গুজব ও ভুল তথ্য বাজারে অতিরিক্ত অস্থিরতা সৃষ্টি করে বিনিয়োগকারীদের ভুল সিদ্ধান্তে ঠেলে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও দেখায়, নির্বাচন শেয়ার বাজারে স্বল্পমেয়াদি ভোলাটিলিটি তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে বাজারের গতিপথ নির্ধারণ করে অর্থনৈতিক ভিত্তি, নীতি ধারাবাহিকতা ও কর্পোরেট সক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ কিংবা এশিয়ার অনেক দেশেই দেখা গেছে—ভোটের ফল প্রকাশের পর নীতির দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হলে বাজার আবার স্বাভাবিক স্থিতিশীলতায় ফিরে আসে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ভোটের উত্তাপে যে শেয়ার বাজারে সাময়িক স্বস্তির ইঙ্গিত মিলছে, তা একটি সুযোগ বটে, তবে সেই সুযোগের সঙ্গে ঝুঁকিও সমানভাবে উপস্থিত। তাই বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কৌশল হলো আবেগ নয়, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের ওপর ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। রাজনৈতিক পরিবেশের পাশাপাশি কোম্পানির আয়, ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সক্ষমতা এবং নীতি-স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দিলে এই অস্থায়ী সুযোগ ভবিষ্যতে টেকসই লাভে রূপ নিতে পারে। ●
অকা/পুঁবা/ই/সকাল/৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 20 hours আগে

