অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইতঃপূর্বে আরোপিত পাল্টা শুল্ক কমানো ঘোষণার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের পুঁজি বাজারে। মূলত ৩০ জুলাই সন্ধ্যা থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের বৈঠকের সূত্র থেকেই একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্তের বিষয় নিশ্চিত হয় দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম। আর এর ফলে গত ৩১ জুলাই পুঁজি বাজার সূচক ও লেনদেনের বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটে। পরবর্তীতে উভয় দেশের সরকারের পক্ষ থেকে শুল্ক কমানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে। আর এরই প্রভাবে ৩ আগস্ট সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের দুই পুঁজি বাজারে ইতিবাচক ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। বড় ধরনের উন্নতি ঘটে উভয় পুঁজি বাজারের লেনদেন ও সূচকে।

প্রধান পুঁজি বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৩ আগস্ট ৯২ দশমিক ৭২ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ৫ হাজার ৪৪৩ দশমিক ৪১ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি ৩ আগস্ট দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৫৩৬ দশমিক ১৪ পয়েন্টে। তবে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সূচকটি একবার পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৫৪৯ দশমিক ৯ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে ডিএসই সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় ১০৬ পয়েন্টের বেশি। তবে পরবর্তীতে দিনের সমন্বয় শেষে ৯২ দশমিক ৭২ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে বাজারটি। এ সময় ডিএসইর অন্য দুই সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ সূচকের যথাক্রমে ৩৬ দশমিক ১০ ও ২২ দশমিক ৯৪ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে।

দেশের দ্বিতীয় পুঁজি বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ৩ আগস্ট ২৮২ দশমিক ০৫ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। বাজারটির অন্য দুই সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স যথাক্রমে ২৬৬ দশমিক ৮৯ ও ১৮০ দশমিক ৫২ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়।

সূচকের ধারাবাহিক উন্নতির প্রভাব ছিল বাজারগুলোর লেনদেনেও। ঢাকা শেয়ার বাজার ৩ আগস্ট ১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৭৪ কোটি টাকা বেশি। ৩১ জুলাই ডিএসইর লেনদেন ছিল ১ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ার বাজারের লেনদেন পৌঁছে যায় ১১ কোটি টাকা থেকে ২০ কোটি টাকায়।

৩ আগস্ট পুঁজি বাজার আচরণ বিশ্লেষণে দেখা যায় ইতঃপূর্বে মার্কিন পাল্টা শুল্ক আরোপের ফলে পুঁজি বাজারে টেক্সটাইল খাতের কোম্পানিগুলোই বেশি দরপতনের শিকার ছিল। ৩ আগস্ট লেনদেনের শুরুতে এ খাতের কোম্পানিগুলোতে মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু পরবর্তীতে অন্যান্য খাতগুলোতেও এ প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে। দাম বাড়ে ব্যাংক, বীমা ছাড়াও অন্যান্য খাতের মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোও। এতে দিনশেষে দেশের দুই পুঁজি বাজারেই লেনদেন হওয়া কোম্পানির বেশির ভাগেরই মূল্যবৃদ্ধি ঘটে।

এ দিকে, পুঁজি বাজারের উন্নয়নে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশনা অনুসারে সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিসমূহের পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়ে অর্থমন্ত্রণালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে সরকারি মালিকানাধীন লাভজনক তথা মৌল ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিসমূহকে পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়ে আলোচনা হয়।

৩ আগস্ট পুঁজি বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান হয়েছে।

বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম স্বাক্ষরিত এ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৩১ জুলাই তারিখে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক ও অতিরিক্ত সচিব মো. সাঈদ কুতুব, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো: জিয়াউল হক, বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সবুর হোসেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্মসচিব ড. দেলোয়ার হোসেন, বিএসইসির পরিচালক মো. আবুল কালাম, পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. শোয়েব, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ, আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিএমবিএ সভাপতি মাজেদা খাতুনসহ আরো অনেকে।

বৈঠকে সরকারি মালিকানাধীন লাভজনক মৌল ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিসমূহকে পুঁজি বাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তির বিষয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি, যেসব বিদেশী বা বহুজাতিক কোম্পানিতে সরকারের মালিকানা রয়েছে, সেগুলোকেও তালিকাভুক্তির মাধ্যমে দ্রুত পুঁজি বাজারে নিয়ে আসার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু কোম্পানির তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যেমন- ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড, কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো), সাইনোভিয়া (সাবেক স্যানোফি) বাংলাদেশ লিমিটেড, নোভাস্টিস (বাংলাদেশ) লিমিটেড, সিনজেন্টা (বাংলাদেশ) লিমিটেড, নেসলে বাংলাদেশ পিএলসি, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড, বি-আর পাওয়ারজেন লিমিটেড, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস্ কোম্পানি লিমিটেড, বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড, জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড, সাধারণ বীমা করপোরেশন এবং জীবন বীমা করপোরেশন।

আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্তি কোম্পানিসমূহের সুশাসন বৃদ্ধি করবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করবে। একই সাথে কোম্পানিগুলোর ভ্যালুয়েশন তথা বাজারমূল্যও পাওয়া যাবে। পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্তি কোম্পানিসমূহের জন্য যেমন ইতিবাচক ফলাফল আনবে, তেমনি দেশের পুঁজি বাজারের জন্যও সুফল বয়ে আনবে।’ তিনি সব অংশীজনকে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা বাস্তবায়নে দ্রুত পদপে গ্রহণের আহ্বান জানান।

প্রসঙ্গত ১১ মে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় পুঁজি বাজারের সঠিক অবস্থা পর্যালোচনা এবং উন্নয়ন নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে অর্থ উপদেষ্টা, বিএসইসি চেয়ারম্যান ও অর্থমন্ত্রণালয়ের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে পুঁজি বাজারের গভীরতা ও ভালো শেয়ারের সরবরাহ বাড়াতে সরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানার অংশ থাকা বহুজাতিক কোম্পানিসমূহের তালিকাভুক্তির বিষয়টিও ছিল।

এ নিয়ে বিএসইসি ইতোমধ্যেই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সমন্বয়ের ভিত্তিতে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ●

অকা/পুঁবা/ফর/রাত/৩ আগস্ট, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 7 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version