অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

দেশের শেয়ারবাজারে গত এক বছরে নারী বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাজারের স্থবিরতা ও বিনিয়োগে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক নারী বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজার থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। এর প্রতিফলন দেখা গেছে বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়ার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে। তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার নারী বিনিয়োগকারী স্থায়ীভাবে তাদের বিও অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছেন।

এই পরিসংখ্যান সামনে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন করা হচ্ছে। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টি যখন বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন শেয়ারবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার বিষয়টি নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা অনেক নারী বিনিয়োগকারীকে নিরুৎসাহিত করছে।

সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৯ মার্চ পর্যন্ত দেশে নারী বিনিয়োগকারীদের বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৪ হাজার ৩১১টি। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে সেই সংখ্যা কমে ২০২৬ সালের ৮ মার্চ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯০ হাজার ৭২৪টিতে। অর্থাৎ এই সময়ে মোট ১৩ হাজার ৫৪৭ জন নারী বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজার থেকে সরে গেছেন।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কেবল নারী বিনিয়োগকারীরাই নয়, একই সময়ে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও বাজার ছাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। তবে শতাংশের হিসেবে নারীদের প্রস্থান তুলনামূলকভাবে বেশি উদ্বেগজনক। এটি ইঙ্গিত করে যে বাজারে আস্থার সংকট নারীদের মধ্যে আরও দ্রুত প্রভাব ফেলছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৯ মার্চ দেশের শেয়ারবাজারে মোট বিও অ্যাকাউন্ট ছিল ১৬ লাখ ৮৭ হাজার ১৫১টি। এক বছর পর সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৫১ হাজার ৭৭৯টিতে। অর্থাৎ এক বছরে মোট ৩৫ হাজার ৩৭২টি বিও অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়েছে।

এই সময়ের মধ্যে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের বিও অ্যাকাউন্টও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ সালে যেখানে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের অ্যাকাউন্ট ছিল ১২ লাখ ৬৫ হাজার ২০৮টি, ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৪৩ হাজার ৫৪টিতে। এর মানে প্রায় ২২ হাজার ১৫৪ জন পুরুষ বিনিয়োগকারীও বাজার থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিনের মন্দা, বিনিয়োগে প্রত্যাশিত মুনাফা না পাওয়া এবং বাজারের ওঠানামা নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেক বিনিয়োগকারীকে নিরুৎসাহিত করেছে। বিশেষ করে নতুন বা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে এই অনিশ্চয়তা আরও বেশি প্রভাব ফেলে। অনেকেই ঝুঁকি কমাতে বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শেয়ারবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নারীরা যখন বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত হন, তখন তা শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক সক্ষমতা বাড়ায় না, বরং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা এখনও পুরোপুরি ফিরে আসেনি। বিশেষ করে নারী বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান প্রস্থান বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারলেই এই প্রবণতা বদলানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অকা/পুঁবা/ই/সকাল/১২ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 6 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version