অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

শেয়ার বাজারের গভীরতা বাড়ানো এবং দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকটে থাকা বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের অংশীদারত্ব থাকা বহুজাতিক ব্লুচিপ কোম্পানিগুলোকে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত করার বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শেয়ার বাজারে গুণগত কোম্পানির সংখ্যা বাড়বে এবং বাজারের সামগ্রিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে একাধিক দেশীয় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সরাসরি তালিকাভুক্তির পথে অগ্রসর হবে। একই সঙ্গে যেসব বহুজাতিক কোম্পানিতে সরকারের শেয়ার রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ বোর্ড সভায় শেয়ার বাজারে আসার বিষয়টি চূড়ান্ত করবে। সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।

গত বুধবার (৭ জানুয়ারি) অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রাথমিকভাবে ১০টি প্রতিষ্ঠানকে শেয়ার বাজারে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ সাংবাদিকদের সামনে সরকারের এই অবস্থান তুলে ধরেন।

বৈঠকে আলোচ্য ১০টি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বাণিজ্য উপদেষ্টা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা, শিল্প উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (অর্থ মন্ত্রণালয়) উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া আইসিবির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানও বৈঠকে অংশ নেন, যা এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব ও নীতিগত সমন্বয়কে স্পষ্ট করে।

যেসব প্রতিষ্ঠানকে শেয়ার বাজারে আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে— কর্ণফুলি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, কর্ণফুলি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো), নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড, সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেড, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড, ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড, সিনোভিয়া বাংলাদেশ লিমিটেড, নোভার্টিস (বাংলাদেশ) লিমিটেড এবং নেসলে বাংলাদেশ পিএলসি।

বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বর্তমানে শেয়ার বাজার মোটামুটি একটি সুসংগঠিত আইনি কাঠামোর ভেতরে এসেছে। এই পর্যায়ে সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো বাজারের গভীরতা বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফিরিয়ে আনা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই মৌলভিত্তি শক্তিশালী রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির শেয়ার ধাপে ধাপে বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বহুজাতিক কোম্পানির তালিকাভুক্তির বিষয়ে তিনি আরও জানান, এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারের অংশীদারত্ব থাকলেও এখনো অনেক কোম্পানি শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত নয়। তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়ে সরকার নীতিগত সম্মতি দিয়েছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বোর্ড সভাতেই নিতে হবে।

এর আগেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে অগ্রগতি হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, এবার পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভিন্ন। মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মতি দেওয়া হয়েছে এবং শিল্প মন্ত্রণালয় থেকেও শেয়ার ছাড়ের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। ফলে এবার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সম্ভাবনা অনেক বেশি।

কোম্পানিগুলোকে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তালিকাভুক্ত হতে বলা হয়েছে কি না—এই প্রশ্নে তিনি জানান, যত দ্রুত সম্ভব প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোম্পানি আইন ও প্রযোজ্য বিধিবিধান উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।

অন্যদিকে, বৈঠক শেষে আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, সরকার এই উদ্যোগকে সম্পূর্ণভাবে জনস্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। তার ভাষায়, জনস্বার্থের চেয়ে বড় কোনো স্বার্থ হতে পারে না। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, নেসলে বা ইউনিলিভারের মতো বহুজাতিক কোম্পানি যদি ভারত, পাকিস্তান কিংবা থাইল্যান্ডের শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারে, তাহলে বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত হতে না পারার যৌক্তিক কারণ থাকা উচিত নয়।

তিনি আরও জানান, প্রয়োজনে এসব কোম্পানিকে কর ছাড়সহ বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। তবে যদি তারা তালিকাভুক্ত হতে অনাগ্রহ দেখায়, তাহলে কর বাড়ানোর মতো কঠোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আনতে হবে। অন্যথায় শেয়ার বাজারকে আরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

দেশীয় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে আইসিবির চেয়ারম্যান জানান, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবরা নীতিগতভাবে সম্মতি দিয়েছেন। তার মতে, ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের ক্ষেত্রে দেরি হওয়ার মতো বাস্তব কোনো কারণ নেই।

ইউনিলিভার বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানটিতে সরকারের প্রায় ৪০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। এর একটি ছোট অংশও যদি শেয়ার বাজারে ছাড়া হয়, তাহলে সেটি বাজারের জন্য বড় ইতিবাচক বার্তা দেবে। তবে বিদেশি বোর্ড সভার অনুমোদনের বিষয়টি বারবার সামনে আসায় প্রক্রিয়াটি কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অকা/পুঁবা/ই/দুপুর/৮ জানুয়ারী, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 7 days আগে

Leave A Reply

Exit mobile version