অর্থকাগজ প্রতিবেদন
শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের বাধ্যবাধকতা আপাতত বহাল থাকছে। তবে বর্তমানের মতো পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশের পরিবর্তে ভবিষ্যতে সংক্ষিপ্ত আর্থিক বিবরণী প্রকাশের বিধান চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। একই সঙ্গে ছয় মাস বা ষান্মাসিক ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের বাধ্যবাধকতা আরোপের প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন বাতিলের বিষয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা প্রকৃত অবস্থাকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না। কমিশনের বর্তমান অবস্থান হলো—ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন ব্যবস্থা বহাল রেখে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে এর কাঠামোকে আরও কার্যকর ও বাস্তবসম্মত করা।

বিএসইসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন সম্পূর্ণ বাতিলের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং কমিশনের লক্ষ্য হচ্ছে আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং গুণগত মান আরও উন্নত করা। তাঁর মতে, নির্ভরযোগ্য আর্থিক তথ্য ছাড়া শেয়ার বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন।

সূত্র জানায়, আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষা কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে বিএসইসি ইতোমধ্যে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) এবং ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)-এর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করেছে। এর মাধ্যমে করপোরেট রিপোর্টিংয়ে জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক তথ্যের মান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে গত ২ জুলাই ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খানের বক্তব্যের পর। সেখানে তিনি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ওপর রিপোর্টিংয়ের চাপ কমাতে বিস্তারিত ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের বর্তমান পদ্ধতি পুনর্বিবেচনার কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক হিসাব মান আইএএস (IAS) ৩৪ অনুসরণের সম্ভাবনা যাচাই করছে কমিশন।

তবে চেয়ারম্যানের বক্তব্যের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন সম্পূর্ণ বাতিল নয়; বরং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত আর্থিক বিবরণী প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি ‘ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন বাতিল হচ্ছে’—এমন শিরোনামে প্রকাশ পাওয়ায় বাজারে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং এ নিয়ে বিনিয়োগকারী ও বাজার-সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

বিএসইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, আইএএস ৩৪ অনুযায়ী অন্তর্বর্তীকালীন আর্থিক প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত আর্থিক বিবরণী প্রকাশের বিধান রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই মানদণ্ড বাস্তবায়নের ধরন এক নয়। কোথাও এটি বাধ্যতামূলক, আবার কোথাও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীতির ওপর নির্ভর করে। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাজ্যে বাধ্যতামূলক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন প্রকাশের বিধান প্রত্যাহার করা হলেও অনেক তালিকাভুক্ত কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত তথ্য দেওয়ার স্বার্থে এখনও স্বেচ্ছায় ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে।

তিনি আরও জানান, শেয়ার বাজারের মতো সংবেদনশীল খাতে রিপোর্টিং কাঠামোয় কোনো বড় পরিবর্তন আনার আগে কমিশন তালিকাভুক্ত কোম্পানি, নিরীক্ষক, বিনিয়োগকারী, বাজার মধ্যস্থতাকারী এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবে। সব পক্ষের মতামত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যদি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সংক্ষিপ্ত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন এবং বিস্তারিত ষান্মাসিক প্রতিবেদন চালু করা হয়, তাহলে একদিকে তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রশাসনিক ও রিপোর্টিং ব্যয় কমতে পারে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রবাহও অব্যাহত থাকবে। তবে এই পরিবর্তনের সফলতা নির্ভর করবে তথ্য প্রকাশের সময়ানুবর্তিতা, স্বচ্ছতা এবং নিরীক্ষার মান নিশ্চিত করার ওপর।

সর্বশেষ হালনাগাদ 16 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version