বিশেষ প্রতিনিধি> 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের শেষ কর্মদিবস আগামীকাল (২৯ জুন)। দায়িত্ব ছাড়ার প্রাক্কালে সিএন্ডএফ (কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং) এজেন্ট লাইসেন্স পরীক্ষাকে ঘিরে তার বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশে বিলম্ব, অতিরিক্ত প্রার্থীকে উত্তীর্ণ করানোর চাপ, মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত এবং পরীক্ষা কমিটির সদস্যদের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নিয়ে রাজস্ব প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, চলতি বছরের ১৬ মে অনুষ্ঠিত সিএন্ডএফ লাইসেন্সের লিখিত পরীক্ষায় ২ হাজার ৫২১ জন অংশ নেন। মূল্যায়ন শেষে ২১০ জনকে উত্তীর্ণ করার সিদ্ধান্ত হলেও পরে এনবিআর চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে আরও ১১০ জনের একটি পৃথক তালিকা কাস্টমস ট্রেনিং একাডেমিতে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ওই তালিকাকে সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর সুপারিশ হিসেবে উল্লেখ করে তালিকাভুক্তদের উত্তীর্ণ করার জন্য চাপ দেওয়া হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হলে চেয়ারম্যানের নিজের চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধিও অনিশ্চিত হতে পারে—এমন বার্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছিল। তবে পরীক্ষা কমিটির সদস্যরা বিধিমালার বাইরে গিয়ে কাউকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর থেকেই ফল প্রকাশ আটকে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

সিএন্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা-২০২৬ অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষার ফল ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ করার কথা। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ফল প্রকাশ না হওয়ায় পরীক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশের পর প্রায় দুই সপ্তাহ বিলম্বে গত ১ জুন ফল প্রকাশ করা হয়।

এরপর মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ করা হলেও সেটি নিয়েও নতুন জটিলতা তৈরি হয়। বিধিমালা অনুযায়ী ২৬ জুনের মধ্যে মৌখিক পরীক্ষা শেষ করার কথা থাকলেও পরীক্ষা কমিটির প্রকাশিত সূচিতে চেয়ারম্যান অসন্তোষ প্রকাশ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরীক্ষা কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সময়সূচি প্রকাশের ঘটনায় চেয়ারম্যান ক্ষুব্ধ হয়ে কাস্টমস ট্রেনিং একাডেমির মহাপরিচালকসহ পরীক্ষা কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন। পরে "অনিবার্য কারণ" দেখিয়ে মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় চেয়ারম্যানের এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, লিখিত পরীক্ষার পর মৌখিক পরীক্ষাও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ায় পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, আব্দুর রহমান খানের নিয়মিত চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তিনি অবসরোত্তর ছুটির (এলপিআর) জন্য আবেদন করেছিলেন। প্রশাসনিক মহলে আলোচনা রয়েছে, অবসরের পরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার প্রত্যাশা থেকেই তিনি বিভিন্ন মহলের প্রত্যাশা পূরণে সক্রিয় ছিলেন বলে সমালোচকদের অভিযোগ। যদিও এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গত বছর আব্দুর রহমান খানের আয়কর রিটার্ন প্রকাশ্যে আসার পরও তাকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। রিটার্নে উত্তরখানে পৈতৃক সম্পত্তি, লালমাটিয়া ও ধানমন্ডিতে দুটি ফ্ল্যাট এবং পূর্বাচলে সরকারি প্লটের তথ্য উল্লেখ ছিল।

সমালোচকদের প্রশ্ন, পৈতৃক সম্পত্তির মালিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি কীভাবে সরকারি প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না।

এ ছাড়া লালমাটিয়ার একটি ফ্ল্যাটের মূল্য ১৮ লাখ টাকা, বসুন্ধরা-মৌচাক এলাকার পাঁচ কাঠা জমির মূল্য ২০ লাখ টাকা এবং ধানমন্ডির একটি বড় ফ্ল্যাটের মূল্য ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা দেখানো হয়। এসব সম্পদের ঘোষিত মূল্য বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তবে এসব বিষয়ে রাষ্ট্রীয় কোনো তদন্তের ফল জনসমক্ষে প্রকাশ হয়নি।

আব্দুর রহমান খানের দায়িত্বকালেই আলোচিত এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট কর-সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া পে-অর্ডারের মাধ্যমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার কালো টাকা সাদা করার ঘটনায় এনবিআরের কিছু কর্মকর্তা বিশেষ সুবিধা দিয়েছিলেন।

গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এনবিআর তদন্ত কমিটি গঠন করে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় এবং রাষ্ট্রের প্রায় ৭৫ কোটি টাকার ক্ষতির বিষয়ও উঠে আসে। তবে জড়িতদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।

ঘটনায় নাম আসা যুগ্ম কর কমিশনার এ কে এম শামসুজ্জামানকে প্রথমে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও পরে তুলনামূলক লঘু শাস্তি দিয়ে পুনর্বহাল করা হয়। বিষয়টি নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।

রাজস্ব প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে অনেকের মতে, গত কয়েক বছরে কর-জিডিপি অনুপাত প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি এবং রাজস্ব আহরণও ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রার নিচে ছিল। কর ফাঁকি রোধে দুর্বলতা, বড় করদাতাদের প্রতি নমনীয়তা এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, এসব ব্যর্থতার দায় থেকে তৎকালীন চেয়ারম্যানকে পুরোপুরি আলাদা করা যায় না।

আব্দুর রহমান খানের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ায় অর্থ পাচারের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, এ-সংক্রান্ত কিছু তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের কাছে রয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন বা সরকারি বক্তব্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। অথচ এনবিআর কর্মকর্তাদের ফাঁসাতে এই চেয়ারম্যান দুদকে ছুটেছেন। এবং অনেককেই নাজেহালও করেছেন। আর নানা কৌশলে আটকে রেখেছেন নিজের ফাইল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিএন্ডএফ লাইসেন্স পরীক্ষায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ, ফল প্রকাশে বিলম্ব, মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত, সম্পদ বিবরণী, কর প্রশাসনের সিদ্ধান্ত এবং অন্যান্য অভিযোগ—সবকিছুই নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

তাদের ভাষ্য, যদি অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তা শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দায় নয়; বরং রাজস্ব প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্যও বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়। আর অভিযোগগুলো অসত্য হলে, সেটিও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

আগামীকাল ২৯ জুন আব্দুর রহমান খানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের শেষ কর্মদিবস। দায়িত্ব ছাড়ার প্রাক্কালে তাকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।

এদিকে, এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে জানতে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

সর্বশেষ হালনাগাদ 10 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version