অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশি অভিবাসীরা প্রবাস থেকে টাকা পাঠাতে প্রায় ২.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিরিক্ত খরচ করেছেন। এই অর্থ দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর একটি—হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণ ব্যয়ের চেয়েও বেশি। অথচ এই বিপুল অর্থ ব্যবহার হতে পারত পরিবারে সঞ্চয়, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার পুঁজিতে।
বিশ্বব্যাংকের রেমিট্যান্স প্রাইসেস ওয়ার্ল্ডওয়াইড (RPW) ডেটাবেইস বিশ্লেষণ করে এ তথ্য সামনে এনেছেন বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংক পরামর্শক হুসেইন সামাদ। বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের পৃষ্ঠপোষকতায় গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।
২০২৪ সালে গড়ে প্রতি ১০০ ডলার রেমিট্যান্স পাঠাতে খরচ হয়েছে ৯ দশমিক ৪০ ডলার। এর মধ্যে ৩ ডলার ছিল সরাসরি লেনদেন ফি এবং বাকি ৬ দশমিক ৩০ ডলার কাটা হয়েছে প্রতিকূল বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারের মাধ্যমে। অন্যদিকে, ভারতে এই খরচ মাত্র ২ দশমিক ৮০ ডলার, পাকিস্তানে ৫ দশমিক ১০ ডলার এবং বৈশ্বিক গড় খরচ ৬ দশমিক ৫০ ডলার।
২০২১ সালে রেমিট্যান্স খরচ ছিল ৪ শতাংশের নিচে। অথচ ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে। গবেষণা বলছে, এই খরচ বৃদ্ধির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে বিনিময় হারের লুকানো মার্জিন, যা ২০২১ সালে ছিল মাত্র ০ দশমিক ৯ শতাংশ, কিন্তু ২০২৪ সালে বেড়ে হয়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
সবচেয়ে বেশি খরচ বেড়েছে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে। ২০২১ সালে সেখানে খরচ ছিল ১ শতাংশের কাছাকাছি, যা ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৯ শতাংশে। মালয়েশিয়াতে এই হার ১০ দশমিক ৮ শতাংশ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১০ শতাংশ। কিছুটা ব্যতিক্রম যুক্তরাজ্য, যেখানে খরচ কমেছে ২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৪ শতাংশে।
গবেষণার প্রধান হুসেইন সামাদ বলেন, বাংলাদেশে রেমিট্যান্স ফিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে বিনিময় হারের গোপন মার্জিন। সেবা প্রদানকারী ব্যাংক বা মানি ট্রান্সফার কোম্পানিগুলো সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে কম রেটে টাকা পরিশোধ করে, ফলে প্রাপক পরিবার কম অর্থ পায়।
২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে টাকার মান ডলারের বিপরীতে ৪১ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে নেমে এসেছে ২৪ বিলিয়নের নিচে। অর্থনৈতিক এই অনিশ্চয়তা পুষিয়ে নিতে অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত নিরাপত্তামূলক মার্জিন আরোপ করছে।
প্রায় ৬৫ লাখ অভিবাসী এই বাড়তি ফি বহন করেছেন। গড়ে যদি প্রতিজন ২০০ ডলার করে পাঠিয়ে থাকেন, তাহলে প্রতি শ্রমিকের ওপর চাপ এসেছে প্রায় ৩৪-৩৫ ডলারের, যা একটি নিম্নআয়ের কর্মীর একদিনের মজুরির চেয়েও বেশি। অর্থাৎ, এই ২.৩ বিলিয়ন ডলার দেশের ভেতরে থাকলে তা হতে পারত গ্রামের মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা ক্ষুদ্র বিনিয়োগের ভিত্তি।
বিশ্লেষণ বলছে, দেশে এখনো রেমিট্যান্স প্রেরণে প্রতিযোগিতার অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকার প্রদত্ত ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনার সুবিধা পেয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান বেশি লাভবান হলেও, অভিবাসীরা সাশ্রয়ী হার পাচ্ছেন না। বরং এই প্রণোদনা অনেক সময় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিজস্ব মার্জিন বাড়ানোর অজুহাত হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের একজন রেমিট্যান্স বিশেষজ্ঞ মুন্সি মো. আশফাকুল আলম বলেন, অনেক অভিবাসী বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই অবস্থান করছেন এবং তাই ব্যাংকিং সেবা নিতে পারেন না। ফলে তারা বাধ্য হন হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক পথে টাকা পাঠাতে, যা দেশকে রাজস্ব হারাতে বাধ্য করে এবং অভিবাসীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
গবেষণাটি বলছে, সরকার চাইলে অনেক দেশের মতো রেমিট্যান্স খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। পাকিস্তান ২০০৯ সালে “Pakistan Remittance Initiative” চালু করে, যার আওতায় ১০০ ডলারের বেশি রেমিট্যান্সে কোনো ফি নেওয়া হয় না। ফলে দেশটিতে হুন্ডির ব্যবহার কমেছে এবং প্রবাসী আয় বেড়েছে।
গবেষক সামাদের মতে, বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য সমাধানের মধ্যে রয়েছে: রেমিট্যান্স ফি ও মার্জিনের ওপর নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ, পাঠানোর আগে ফি ও বিনিময় হারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অভিবাসী প্রশিক্ষণে এসব বিষয়ে তথ্য সংযোজন এবং প্রণোদনা পদ্ধতির সংস্কার।
রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি প্রধান ভিত্তি। কিন্তু অভিবাসীরা সেই অর্থ পাঠাতে গিয়ে যে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করছেন, তা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, নৈতিক প্রশ্নও তোলে। সরকার এবং নীতিনির্ধারকদের উচিত এখনই এই খাতে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে অভিবাসীদের সাশ্রয় নিশ্চিত করা। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/দুপুর/১৭ মে,২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 10 months আগে

