অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে গত বছর বড় ধরনের চাপের মুখে পড়া মার্কিন ডলার ২০২৬ সালের শুরুতে আবারও শক্ত অবস্থানে ফিরে এসেছে। তবে এর পেছনের প্রেক্ষাপট ও ঝুঁকিগুলো এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সুদের হারের ব্যবধান সংকুচিত হওয়া, মার্কিন আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব এবং ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন—এই সবগুলো কারণই ডলারের গত বছরের দরপতনের জন্য দায়ী ছিল এবং চলতি বছরেও এসব ঝুঁকি বহাল রয়েছে।

বেশিরভাগ প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলার শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। বিনিয়োগকারীরা এখন চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত হতে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন অর্থনৈতিক তথ্যের দিকে গভীর নজর রাখছেন, কারণ এসব তথ্য ফেডারেল রিজার্ভের ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণ এবং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০১৭ সালের পর গত বছরই ডলারের সবচেয়ে বড় বার্ষিক দরপতন ঘটে—যার হার ছিল ৯ শতাংশেরও বেশি। অন্যান্য অর্থনীতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হারের পার্থক্য কমে আসা, রাজস্ব ও ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংঘাত এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল করে দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঝুঁকি পুরোপুরি দূর না হওয়ায় ডলারের ভবিষ্যৎ গতিপথ এখনও অনিশ্চিত।

আগামী সপ্তাহে প্রকাশিত হতে যাওয়া বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকের মধ্যে শুক্রবারের নন-ফার্ম পেরোল রিপোর্টকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। এই প্রতিবেদন থেকে ধারণা পাওয়া যেতে পারে যে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার আরও কমানোর পথে হাঁটবে কি না। বাজার ইতোমধ্যেই চলতি বছরে দুই দফা সুদ কমানোর সম্ভাবনা ধরে নিচ্ছে, যদিও ফেডের বিভক্ত নীতিনির্ধারক বোর্ড এখন পর্যন্ত মাত্র একবার হার কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।

মোনেক্স ইউএসএর ওয়াশিংটনভিত্তিক ট্রেডিং পরিচালক জুয়ান পেরেজের মতে, বর্তমান সময়টি হবে নানামুখী ঝুঁকি ও তথ্য মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। যদিও চলতি মাসের শেষের আগে ফেডারেল রিজার্ভের কোনো নীতিনির্ধারণী বৈঠক নেই, তবুও বাজারে এ বিষয়ে এখনো ঐকমত্য তৈরি হয়নি।

এদিকে, মার্কিন সরকারের সাম্প্রতিক দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা অর্থনৈতিক তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও যাচাই প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। এই অচলাবস্থা নজিরবিহীন হওয়ায় বাজারে প্রকাশিত তথ্যের নির্ভুলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

গত শুক্রবার জাপান ও চীনের বাজার বন্ধ থাকায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে লেনদেনের পরিমাণ ছিল তুলনামূলকভাবে কম। তবুও ডলার ইনডেক্স—যা বিশ্বের প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে ডলারের শক্তিমত্তা পরিমাপ করে—০ দশমিক ২৪ শতাংশ বেড়ে ৯৮ দশমিক ৪৮-এ পৌঁছেছে। অপরদিকে ইউরোর মান ০ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ১৭১৬ ডলারে।

একটি সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে ইউরো জোনের উৎপাদন খাতের কার্যক্রম গত নয় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। যদিও লক্ষণীয় যে, ২০২৫ সালে ইউরোর মান ১৩ শতাংশেরও বেশি বেড়েছিল, যা ২০১৭ সালের পর এই মুদ্রার সর্বোচ্চ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি।

ব্রিটিশ পাউন্ড বা স্টার্লিংয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার পর শুক্রবার স্টার্লিংয়ের মান ০ দশমিক ১৮ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৩৪৪৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের এই প্রবৃদ্ধি ছিল পাউন্ডের জন্যও ২০১৭ সালের পর সর্বোচ্চ।

বিনিয়োগকারীরা এখন বিশেষভাবে নজর রাখছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কাকে ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করেন, কারণ বর্তমান চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের মেয়াদ মে মাসে শেষ হতে যাচ্ছে। ট্রাম্প ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, তিনি চলতি মাসেই তার পছন্দের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন।

বাজারের বড় একটি অংশ মনে করছে, ট্রাম্পের মনোনীত ব্যক্তি সুদের হার কমানোর পক্ষে অবস্থান নেবেন। কারণ ট্রাম্প একাধিকবার ফেডারেল রিজার্ভ ও জেরোম পাওয়েলের সমালোচনা করে বলেছেন, তারা সুদের হার দ্রুত ও যথেষ্ট পরিমাণে কমাতে ব্যর্থ হয়েছেন।

এই প্রেক্ষাপটে ট্রেডাররা চলতি বছরে দুই দফা সুদ কমানোর বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত ধরেই এগোচ্ছেন, যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান পূর্বাভাস এখনো তুলনামূলকভাবে সংযত।

গোল্ডম্যান স্যাকসের কৌশলবিদরা এক নোটে উল্লেখ করেছেন, মধ্যমেয়াদে ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ ২০২৬ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে ফেডের নেতৃত্বে আসন্ন পরিবর্তন তাদের ফেডারেল ফান্ড রেট পূর্বাভাসে নিম্নমুখী ঝুঁকি তৈরি করছে।

জাপানি ইয়েনও চাপের মধ্যে রয়েছে। ২০২৫ সালে ডলারের বিপরীতে ১ শতাংশেরও কম শক্তিশালী হওয়ার পর শুক্রবার ইয়েন আরও ০ দশমিক ১৬ শতাংশ দুর্বল হয়ে ডলারপ্রতি ১৫৬ দশমিক ৯১-এ নেমে আসে। নভেম্বর মাসে ইয়েন ১০ মাসের সর্বনিম্ন ১৫৭ দশমিক ৮৯-এ পৌঁছালে জাপানের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের জল্পনা বাড়ে।

যদিও ব্যাংক অফ জাপান গত বছর দুই দফা সুদের হার বাড়িয়েছে, তবুও তা ইয়েনকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করতে পারেনি। কারণ বিনিয়োগকারীরা আরও কঠোর ও আগ্রাসী নীতিগত পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন। এলএসইজি-এর তথ্য অনুযায়ী, আগামী জুলাইয়ের আগে ব্যাংক অফ জাপানের সুদের হার পুনরায় বাড়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশের নিচেই রয়েছে।

অন্যদিকে, ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। শুক্রবার বিটকয়েনের দাম ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৭৪১ দশমিক ৬১ ডলারে।

অকা/ব্যাংখা/ই/রাত/৭ জানুয়ারী, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

Leave A Reply

Exit mobile version