আমদানিতে টানা ১৬ মাস ধরে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) বৃহৎ শিল্প বিশেষত ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক। এ সময় জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধি নেমে গেছে পৌনে চার শতাংশে। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নসহ অন্যান্য খাতেও ছিল মন্দা। অর্থনীতিতে চলা এ স্থবিরতার মাঝেও বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার বিক্রি থেমে নেই।

চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে গত সোমবার পর্যন্ত সরকারি আমদানি চাহিদা মেটাতে ১১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়েছে। অর্থাৎ ৯ মাস ২২ দিনে এ পরিমাণ ডলার বিক্রি করা হয়। গত অর্থবছরের ৯ মাস ১০ দিনে বিক্রির পরিমাণ ছিল সাড়ে ১১ বিলিয়ন ডলার।

ডলার বিক্রির প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। ধারাবাহিকভাবে কমছে রিজার্ভ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবপদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে ১৯ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৯৮৯ কোটি ডলারে নেমেছে। তবে নিট রিজার্ভ ১৫ বিলিয়ন ডলারের ঘরেই রয়েছে, যা আইএমফের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪ বিলিয়ন ডলার কম। এ অবস্থায় গতকাল মঙ্গলবার আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ২ সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশ সফরে এসেছে। এই প্রতিনিধিদল ঋণের শর্তের অগ্রগতিসহ অর্থনৈতিক অবস্থা মূল্যায়ন করবে। এরপর ঋণের তৃতীয় কিস্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে আইএমএফ।

সূত্র জানায়, দেশের ব্যবহারযোগ্য বা প্রকৃত রিজার্ভ এখন ১৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের ঘরে। প্রকৃত রিজার্ভ হলো দায়হীন রিজার্ভ। প্রকৃত রিজার্ভের হিসাব কীভাবে নির্ণয় করতে হবে, তা আইএমএফ ঋণ দেয়ার সময় বাংলাদেশকে জানিয়ে দিয়েছিল। সংস্থাটি ঋণের শর্ত হিসেবে নির্দিষ্ট সময় পরপর প্রকৃত রিজার্ভ কী পরিমাণে থাকতে হবে, তা ঠিক করে দেয়। তাই বাংলাদেশকে আইএমএফের শর্ত মেনে প্রতি তিন মাস পরপর রিজার্ভ সংরক্ষণ করতে হয়।

আইএমএফ বাংলাদেশকে যে ঋণ দিয়েছে, তার শর্ত অনুযায়ী গত মার্চ শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রকৃত রিজার্ভ থাকার কথা ১ হাজার ৯২৬ কোটি ডলার। কিন্তু ওই সময় প্রকৃত রিজার্ভ ছিল ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের ঘরে।

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ?রপ্তানি ও রেমিট্যান্স ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার কারণে কমছে আমদানিও। এরপর দেশে ডলারের সংকট এখনও কাটেনি। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রি অব্যাহত রয়েছে। রিজার্ভ থেকে ক্রমাগত ডলার বিক্রি ও ব্যাংকগুলো তাদের জমা রাখা ডলার ফেরত নেয়ায় রিজার্ভ কমছে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, বাজারে এখনও ডলারের ঘাটতি রয়েছে। ডলারের চাহিদা যতটা, সরবরাহ তার তুলনায় কম। তাই প্রতিদিন ডলার বিক্রি করে জোগান দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আপাতত আর কোনো বিকল্প নেই।

জানা যায়, ব্যাংকগুলোয় এখন ১০৯ টাকা ৫০ পয়সা দামে প্রবাসী ও রপ্তানি আয়ে ডলার কেনার দর নির্ধারণ করা রয়েছে। আর আমদানিকারকদের কাছে বিক্রির ক্ষেত্রে ডলারের আনুষ্ঠানিক দাম হচ্ছে ১১০ টাকা। তবে বেশিরভাগ ব্যাংক ডলার বিক্রিতে ১১০ টাকার বেশি নিচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোর প্রবাসী আয়ে নিজেদের আড়াই শতাংশ প্রণোদনাসহ প্রতি ডলার কেনার কথা ১১২ টাকায়। তবে কিছু ব্যাংক এখনও প্রবাসী আয় কিনছে ১১৬-১৭ টাকায়। যদিও মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে রেমিট্যান্সের এই ডলারের দাম ১১২.৫ থেকে ১১৩ টাকায় নেমে গিয়েছিল। অবশ্য ফেব্রুয়ারি শেষে রেমিট্যান্সে ডলারের জন্য ১২০-১২২ টাকা পর্যন্ত অফার করেছিল ব্যাংকগুলো। এর আগে রেমিট্যান্সে ডলারের সর্বোচ্চ দর উঠেছিল ১২৩ টাকায়।

ব্যাংকাররা জানান, এলসি (ঋণপত্র) নিষ্পত্তিতে ডলারের চাহিদা বেড়ে যাওয়া এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী কর্মকর্তা ব্যাংকগুলোকে বেশি দাম দিয়ে হলেও রেমিট্যান্স বাড়ানোর পরামর্শ দেয়ার কারণে এক মাসের ব্যবধানে রেমিট্যান্সের ডলারের দাম ৩ থেকে ৪ টাকা বেড়েছে।

সূত্র জানায়, গত ৩৩ মাস ২২ দিনে রিজার্ভ থেকে ৩২ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে রিজার্ভ থেকে প্রায় ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। আর চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে গত সোমবার পর্যন্ত ১১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়। তবে এই তিন বছরে সামান্য কিছু ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাও আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী রিজার্ভ ধরে রাখতে এই ডলার কেনা হয়। পাশাপাশি কারেন্সি সোয়াপের মাধ্যমেও রিজার্ভ বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও মার্চে আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী নিট রিজার্ভ রাখতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।

অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক আগে বেসরকারি আমদানিকারকদের ডলার দিলেও এখন দিচ্ছে না। ফলে ডলার-সংকটে আমদানির এলসি খোলা কমিয়ে দেয় ব্যাংকগুলো। বর্তমানে ছোট-বড় সব আমদানিকারকই এলসি খুলতে সমস্যায় পড়ছেন।

প্রসঙ্গত, ঢাকায় আসা আইএমএফের প্রতিনিধিদলটি আগামী ৮ মে পর্যন্ত ঋণ কর্মসূচির আওতায় থাকা বিভিন্ন মানদণ্ড, লক্ষ্যমাত্রা ও মাপকাঠি পূরণের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, নিট রিজার্ভ ছাড়া আইএমএফের বাকি সব শর্তই মোটামুটি পূরণ করতে পেরেছে বাংলাদেশ।

অকা/ব্যাংখা/সকাল/২৪ এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 2 years আগে

Leave A Reply

Exit mobile version