অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

দেশের শেয়ার বাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরেই স্থবির অবস্থায় রয়েছে। নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও বাজারে নতুন কোম্পানির আগমন ত্বরান্বিত হয়নি; বরং পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এই স্থবিরতা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আইপিও অনুমোদনের পর একটি কোম্পানির কার্যত তালিকাভুক্ত হয়ে লেনদেন শুরু করতে প্রায় এক বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়—যা বাজারের গতিশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে।

উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে সর্বশেষ পাঁচটি কোম্পানি শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। এগুলো হলো—সিকদার ইনস্যুরেন্স, এনআরবি ব্যাংক, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, বেস্ট হোল্ডিং এবং টেকনো ড্রাগ। এর মধ্যে টেকনো ড্রাগ ওই বছরের জুলাই মাসে সর্বশেষ তালিকাভুক্ত হয়। এরপর প্রায় দুই বছর অতিক্রান্ত হলেও নতুন কোনো কোম্পানির অন্তর্ভুক্তি ঘটেনি, যা বাজারে নতুন বিনিয়োগের সুযোগকে সংকুচিত করেছে।

আইপিও প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুততর করার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করেছিল। পাশাপাশি বহুজাতিক ও সরকারি কোম্পানিকে শেয়ার বাজারে আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবায়নের পর্যায়ে গিয়ে এসব উদ্যোগ নানা প্রশাসনিক জটিলতা, নীতিগত অসামঞ্জস্য এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতির কারণে কার্যকর হয়নি। ফলে প্রত্যাশা থাকলেও ফলাফল দৃশ্যমান হয়নি।

বর্তমানে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও শেয়ার বাজার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কোনো কাঠামোগত সংস্কার এখনো চোখে পড়ছে না। অন্য খাতে সংস্কারের আলোচনা থাকলেও শেয়ার বাজারে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে। এমনকি সমালোচনার মুখে থাকা নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকেও দৃশ্যমান সংস্কার উদ্যোগের অভাব নিয়ে বাজারে অসন্তোষ রয়েছে।

বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী, আইপিও আবেদনের জন্য কোম্পানির প্রসপেক্টাসে সংযুক্ত নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন ১২০ দিনের বেশি পুরোনো হতে পারবে না। পাশাপাশি শুধুমাত্র অর্ধবার্ষিক বা প্রান্তিক নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন দিয়ে আবেদন করার সুযোগ নেই। এই শর্তগুলো অনেক সম্ভাবনাময় কোম্পানির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে যেসব কোম্পানি দ্রুত আইপিওতে আসতে চায়।

আয়কর নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাব বছর শেষ হয় ৩১ ডিসেম্বর এবং অন্যান্য কোম্পানির ক্ষেত্রে ৩০ জুন। এই সময়সূচি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই আইপিও আবেদন করতে হয়। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ কোম্পানিই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারে না, ফলে তারা আইপিও সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়ে।

আইপিওতে আসার জন্য সর্বশেষ অর্থবছরে মুনাফা থাকা এবং কোনো সঞ্চিত লোকসান না থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক চাপে অনেক কোম্পানির পক্ষে এই শর্ত পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে সম্ভাব্য অনেক কোম্পানি আইপিও পরিকল্পনা থেকে সরে আসছে বা তা স্থগিত রাখছে।

বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক নয়। ফলে তারা এ বিষয়ে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। অন্যদিকে সরকারি মালিকানাধীন বড় কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বোর্ড অনুমোদন, নীতিগত বিলম্ব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি।

আগামী ৩০ জুনে যেসব কোম্পানির হিসাব বছর শেষ হবে, তাদের ওপরই এখন আইপিও বাজার অনেকটা নির্ভর করছে। এসব কোম্পানি সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর নাগাদ আবেদন করতে পারবে। তবে আবেদন জমার পর যাচাই-বাছাই, অনুমোদন এবং তালিকাভুক্তির পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দেড় থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।

নতুন বিধিমালায় স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা স্বচ্ছতা বাড়ালেও সময়সীমা আরও দীর্ঘ করেছে। ফলে চলতি বছর নতুন কোনো কোম্পানির তালিকাভুক্তি ও লেনদেন শুরুর সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।

বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই স্থবিরতা কাটানো সম্ভব নয়। আইপিও প্রক্রিয়া দ্রুততর করা, বিধিনিষেধ বাস্তবসম্মত করা এবং বড় কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনতে প্রণোদনা দেওয়া—এই তিনটি দিকেই এখন জোর দেওয়া জরুরি। অন্যথায়, ২০২৫ সালের মতো ২০২৬ সালও আইপিওশূন্য থেকে যেতে পারে, যা দেশের শেয়ার বাজারের ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ও উদ্বেগজনক নজির হয়ে দাঁড়াবে।

অকা/পুঁবা/ই/সকাল/৩০ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 18 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version