অর্থকাগজ প্রতিবেদন

দেশের লজিস্টিকস ও বন্দর খাতে আরও বেশি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন এনেছে সরকার। বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) ও অফ-ডক সুবিধা পরিচালনায় বিদেশি মালিকানার দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে আগামী ১ জুলাই থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এসব প্রতিষ্ঠানে শতভাগ মালিকানা নিয়ে বিনিয়োগ ও পরিচালনার সুযোগ পাবেন।

জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি বাংলাদেশের লজিস্টিকস শিল্পে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করবে।

এতদিন বিদেশি অপারেটরদের স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করতে হতো এবং স্থানীয় উদ্যোক্তারাই নিয়ন্ত্রণমূলক মালিকানা ধরে রাখতেন। নতুন নীতির আওতায় বৈশ্বিক লজিস্টিকস ও বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন স্বাধীনভাবে আইসিডি ও অফ-ডক স্থাপন এবং পরিচালনা করতে পারবে।

বিশ্লেষকদের মতে, রফতানি বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, শিল্পায়নের গতি বৃদ্ধি এবং পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়েই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী বছরগুলোতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কনটেইনার পরিচালনা ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন হবে, যা নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে সহজতর হতে পারে।

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বেসরকারি খাতে পরিচালিত ২৪টি আইসিডি রয়েছে। এসব ডিপোর সম্মিলিত ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার টিইইউ (টোয়েন্টি-ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট)। প্রতি মাসে এসব স্থাপনায় প্রায় ৯০ হাজার রপ্তানি কনটেইনার, ৫০ হাজার আমদানি কনটেইনার এবং ৬০ হাজার খালি কনটেইনার পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি আরও তিনটি নতুন আইসিডি নির্মাণাধীন রয়েছে, যা আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা নীতিগত উদারীকরণকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও তারা মনে করেন, শুধু মালিকানার বিধিনিষেধ তুলে দিলেই বড় আকারের বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না। বিনিয়োগকারীরা অবকাঠামোর মান, বন্দর ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, পরিবহন সংযোগ, ডিজিটাল সেবা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতার বিষয়গুলো গভীরভাবে বিবেচনা করবে।

বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদারের মতে, বিনিয়োগকারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিচালনাগত দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি মুনাফার নিশ্চয়তা। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নয়ন, কাস্টমস কার্যক্রমের ডিজিটালাইজেশন এবং স্বচ্ছ ট্যারিফ কাঠামো নিশ্চিত করা গেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও বাড়বে।

অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য জাফর আলম মনে করেন, আন্তর্জাতিক অপারেটরদের অংশগ্রহণ দেশের লজিস্টিকস খাতে আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা সংস্কৃতি নিয়ে আসবে। এর ফলে কনটেইনার পরিচালনার গতি বাড়বে, সেবার মান উন্নত হবে এবং বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কার্যক্রম গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক সেরা চর্চা অনুসরণের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বিশ্বের শীর্ষ বন্দর ও লজিস্টিকস অপারেটরদের মধ্যে ডিপি ওয়ার্ল্ড, মেডলগ, রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি), এপিএম টার্মিনালস এবং পিএসএ সিঙ্গাপুর ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বন্দর ও অফ-ডক খাতে বিনিয়োগ করেছে অথবা বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। নতুন নীতির ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি মালিকানার সীমা তুলে দেওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় সংস্কার। তবে এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জিত হলে বাংলাদেশ শুধু বিদেশি বিনিয়োগই আকর্ষণ করবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিকস ও বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবেও নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারবে।

সর্বশেষ হালনাগাদ 2 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version