অর্থকাগজ প্রতিবেদন

দীর্ঘদিনের মন্দায় বিপর্যস্ত শেয়ার বাজারে নতুন করে চাপ সৃষ্টি এড়াতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)-কে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ পরিশোধে আরও তিন বছর সময় দিয়েছে সরকার। তবে শুধু সময় বাড়িয়েই দায়িত্ব শেষ করেনি সরকার; বরং ঋণ পরিশোধ নিশ্চিত করতে আর্থিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত তদারকিসহ একাধিক কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) জারি করা এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ১৩ মে থেকে কার্যকরভাবে আইসিবির ঋণের বিপরীতে সরকারের দেওয়া সার্বভৌম গ্যারান্টির মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে বর্ধিত এই সময়ের মধ্যেই ৩ হাজার কোটি টাকার মূল ঋণ সম্পূর্ণ পরিশোধ করতে হবে। ঋণচুক্তির অন্যান্য শর্ত অপরিবর্তিত থাকবে।

বাজারে ধাক্কা এড়াতেই সময় বৃদ্ধি

জানা গেছে, চলতি বছরের মে মাসে ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত সময় শেষ হলেও তীব্র তারল্য সংকটের কারণে আইসিবি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়। পরে সরকারের কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন জানায় প্রতিষ্ঠানটি।

সরকারকে দেওয়া আবেদনে আইসিবি জানায়, নির্ধারিত সময়েই ঋণ পরিশোধ করতে হলে তাদের বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করতে হবে। এতে দীর্ঘদিন ধরে চাপের মধ্যে থাকা শেয়ার বাজারে বড় ধরনের বিক্রির চাপ তৈরি হতে পারে, যা বাজারে মূল্যপতন ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সরকার সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতে, এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য শেয়ার বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পুনর্গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করা।

সময় বাড়লেও নজরদারিতে থাকবে আইসিবি

সরকার সময় বাড়ানোর পাশাপাশি আইসিবির কার্যক্রমে কড়া নজরদারির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এফআইডির নির্দেশনা অনুযায়ী, বর্ধিত সময়ের পুরো মেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার কেনাবেচা, বিনিয়োগ কৌশল এবং পোর্টফোলিও পুনর্গঠন কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।

একই সঙ্গে প্রশাসনিক ও পরিচালন ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা, ঋণের সুদের চাপ কমানো এবং বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে সৃষ্ট মূলধন ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক ও বাস্তবায়নযোগ্য একটি ‘বিজনেস রিকভারি প্ল্যান’ তৈরি করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে জমা দিতে হবে। শুধু পরিকল্পনা প্রণয়নই নয়, এর বাস্তবায়ন অগ্রগতিও নিয়মিত মূল্যায়ন করবে সরকার।

এ ছাড়া প্রতি তিন মাস অন্তর আইসিবিকে তার তারল্য পরিস্থিতি, শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ কার্যক্রম, ঋণ পরিশোধের প্রস্তুতি এবং আর্থিক অবস্থার হালনাগাদ প্রতিবেদন অর্থ বিভাগ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে জমা দিতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন ঋণ পরিশোধ সূচিও চূড়ান্ত করতে হবে।

মন্দায় কমেছে বিনিয়োগের মূল্য

দীর্ঘমেয়াদি মন্দার কারণে আইসিবির বিনিয়োগ পোর্টফোলিও বড় ধরনের মূল্যহ্রাসের মুখে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, শেয়ার বাজারে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগের বাজারমূল্য ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে কমে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। ফলে পোর্টফোলিওতে প্রায় ৫ হাজার ৫০৬ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

বাজারমূল্যের এই পতন আইসিবির আর্থিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের বিপরীতে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার সুদও পরিশোধ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। একসময় শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে শত শত কোটি টাকা মুনাফা করা আইসিবি এখন ধারাবাহিক লোকসানের চক্রে আটকে পড়েছে।

ব্যয় কমলেও সুদের চাপ অস্বাভাবিক

আইসিবির কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু সংস্কার আনা হয়েছে। অতীতে যেসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, সেগুলো বন্ধে পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি চালু করা হয়েছে।

বর্তমানে ব্লক মার্কেটের মাধ্যমে শেয়ার কেনা বন্ধ করা হয়েছে। প্রতিদিন বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা হয় এবং প্রতি ১৫ দিন অন্তর সেই প্রতিবেদন পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কর্মকর্তাদের দাবি, এসব পদক্ষেপের ফলে বিনিয়োগে ক্ষতির গতি আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।

তবে তাদের মতে, প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন পরিচালন ব্যয় নয়, বরং ঋণের সুদের বোঝা। বছরে পরিচালন ব্যয় যেখানে মাত্র ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ, সেখানে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে বর্তমান আয় দিয়ে সুদের দায় মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।

ঘুরে দাঁড়াতে প্রয়োজন পুনঃঅর্থায়ন

আইসিবির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটিকে টেকসইভাবে পুনরুদ্ধার করতে সরকারের পক্ষ থেকে স্বল্পসুদে নতুন অর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ বর্তমানে মূলধনী মুনাফা, লভ্যাংশ আয় এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত আয় মিলিয়েও ঋণের সুদ ব্যয় পূরণ করা যাচ্ছে না।

এর সঙ্গে পরিচালন ব্যয়, বিনিয়োগের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ (প্রভিশন) এবং বাজারমূল্য হ্রাসজনিত ক্ষতি যোগ হওয়ায় আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে।

লোকসানের ধারাবাহিকতা অব্যাহত

সাম্প্রতিক আর্থিক ফলাফলও আইসিবির সংকটের গভীরতা তুলে ধরছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়ে। এরপর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই আরও ৫৮৮ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

যদিও শেষ প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন এখনও প্রকাশিত হয়নি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, পুরো অর্থবছর শেষে প্রতিষ্ঠানটি আবারও লোকসানে থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকার সময় বাড়িয়ে তাৎক্ষণিকভাবে শেয়ার বাজারে বড় ধরনের বিক্রির চাপ এড়াতে সক্ষম হলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। আইসিবির আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা, ঋণের সুদের বোঝা কমানো, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনঃঅর্থায়নের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে ভবিষ্যতে একই সংকট আবারও ফিরে আসতে পারে। একই সঙ্গে দেশের পুঁজি বাজারে বাজারসৃষ্টিকারী (মার্কেট স্ট্যাবিলাইজার) হিসেবে আইসিবির কার্যকর ভূমিকা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বশেষ হালনাগাদ 4 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version