তারেক আবেদীন

আবারও আলোচনায় দ্বিতীয় প্রজন্মের জীবন বীমা কোম্পানি হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড। পরিচালকদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব নয় এবার। লড়াই যেন খোদ নিয়ন্ত্রক বনাম কোম্পানিটির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার মধ্যে। বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআর) ১৪ আগস্ট, ২০২৩ এক পত্রে (স্মারক নং-৫৩.০৩.০০০০.০৩৬.০১.০০১.২৩) হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ড. বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডলকে বীমা আইন ২০১০ এর ৫০ ধারায় ১ (খ) ক্ষমতাবলে কেন তাকে অপসারণ করা হবে না তার লিখিত জবাব চেয়ে প্রধান নির্বাহী পদে দায়িত্ব পালনে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে।

ড. বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডল ২১ আগস্ট, ২০২৩ তারিখে কারণ দর্শানোর (শো কজ) জবাব দিয়েছেন। ড. মন্ডলের বিরুদ্ধে আইডিআর’র অভিযোগ ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালের কোম্পানিটির অনিষ্পন্ন বীমা দাবী, ব্যবস্থাপনা ব্যয়, কমিশন প্রদান, সকল লেনদেন ও কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা সংক্রান্ত হিসাব ও অন্যান্য বিষয় যাচাইয়ে তাদের নিয়োগকৃত নিরীক্ষকের বিশেষ নিরীক্ষায় তাঁর সহযোগিতা না করা। নিরীক্ষা ফার্ম হুসেইন ফরহাদ এন্ড কোম্পানির বিশেষ নিরীক্ষা কাজে ‘অসহযোগিতা’ করার অভিযোগ তুলে নিরীক্ষকের প্রতিবেদন অনুযায়ি ৪ পৃষ্ঠাব্যাপী কারণ দর্শানোর চিঠিতে হোমল্যান্ড লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ড. বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডলকে ৫টি বিষয়ে ব্যাখ্যা তলব করা হয়। বিয়য়গুলো হলো – কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে অনিয়ম, লাইসেন্সবিহীন এজেন্টকে কমিশন প্রদান, অনিষ্পন্ন বীমা দাবীর অর্থ ও সংখ্যায় গড়মিল, হিসাববিহীন নবায়ন প্রিমিয়াম আয়, ব্যবসায়ে সমাপনী তথ্য এবং প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম আয়ের তথ্য না দেওয়া, এবং প্রশাসনিক ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে অনিয়ম এবং ভাউচার ও নথি প্রদানে অসহযোগিতা।

হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ড. বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডল একাধিক সংযুক্তিসহ ৫ পৃষ্ঠাব্যাপী জবাবে প্রতিটি বিষয়ে পুংখানুপংখভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি নিয়ন্ত্রককে কারণ দর্শানোর জবাবে জানান, বিশেষ নিরীক্ষার সময়কালে (২০১৮-২০২০) তিনি কোম্পানিটিতে ছিলেন না। তিনি কোম্পানিতে যোগদান করেন ২০২২ সালের ২৪ মে। মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মন্ডল জবাবে জানান, কোম্পানিটিতে তাঁর যোগদানের পর থেকে তিনি গ্রাহকের ৩৫ কোটি ৯ লাখ টাকার বীমা দাবী পরিশোধ করেছেন। তিনি জানান, নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তথ্য সরবরাহ এবং নিরীক্ষা কাজ পরিচালনার জন্য ২০২২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর নিরীক্ষক নিয়োগপত্র অনুমোদন করেন। সে অনুযায়ি নিরীক্ষক ফার্মকে সহযোগিতার জন্য কোম্পানির অর্থ ও হিসাব বিভাগের সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট আশিষ মালাকারকে দায়িত্ব দেন। নিরীক্ষক ফার্মের চাহিদানুযায়ি ইমেইলে তথ্য সরবরাহ করা হয়। উল্লেখ্য, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২ নিরীক্ষক নিয়োগের ১ মাস ৩ দিন পর ১৭ অক্টোবর, ২০২২ নিরীক্ষা কাজে যোগ দেন। ২৫ অক্টোবর, ২০২২ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি অবধি ই মেইলের মাধ্যমে ৫১টি তথ্য সরবরাহ করা হয়। সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট আশিষ মালাকার ২ জুলাই, ২০২৩ কোম্পানির চাকরি ছেড়ে চলে যান। ব্যক্তিগত কারণে আশিষ মালাকার কোম্পানির সকল কাগজপত্র বুঝিয়ে দিয়ে যাননি। তাছাড়া তিনি ঢাকার বাহিরে অবস্থান করায় নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের শুনানীর দিন (১০ আগস্ট, ২০২৩) সকল কাগজপত্রসহ উপস্থিত থাকা তার সম্ভব হয়নি। ওইদিন পরিচিত পর্বের শুরুতে মৌখিকভাবে আইডিআরকে অবহিত তা করা হয়। কোম্পানির ব্যাংক হিসাব অনিয়ম প্রসঙ্গে জবাবপত্রে ৫টি ব্যাংক হিসাব বিররণী সংযুক্ত করে তিনি বলেন, কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে স্থান সংকুলান না হওয়ায় শ্যামলী ও দৈনিক বাংলায় কোম্পানির স্টোর রুমে নথিপত্র রাখা হয়। স্টোর রুমে দায়িত্বে যারা ছিলেন তারা অনেকেই এখন কোম্পানিতে নেই।

হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ড. বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডলকে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এর পরিচালক (লাইফ) এস. এম. মাসুদুল স্বাক্ষরিত ১৪ আগস্টের কারণ দর্শানোর নোটিশের পর ২০ আগস্ট কোম্পানির মতিঝিলস্থ প্রধান কার্যালয়ের পর্ষদ কক্ষে চেয়ারম্যান হান্নান মিয়ার সভাপতিত্বে জরুরী সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিষয় নিশ্চিত করেন কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ আলী মিয়া। তিনি সভায় কি সিদ্ধান্ত হয়েছে তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি অর্থকাগজকে জানান, এমডি স্যার অফিসে আসেন, তার কক্ষেই তিনি অবস্থান করেন, তবে কোন কাজ করছেন না। সভায় উপস্থিত কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জুলহাস পরবর্তি করণীয় সম্পর্কে অর্থকাগজকে জানান, নিয়ন্ত্রণকারি প্রতিষ্ঠান বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এর সিদ্ধান্তের বাইরে আমরা যেতে পারি না। তাই কোম্পানির নির্বাহী কাজ পরিচালনার জন্য উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুল আলমকে মুখ্য নির্বাহী পদে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

কোম্পানির সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে চেয়ে হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর চেয়ারম্যান হান্নান মিয়া, একাধিক পরিচালক, মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ড. বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডল, উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফরিদুল আলমের সেলফোনে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হলে কেউই ফোন ধরেননি। ফোন করা হয় পরিচালক হোসনে আরা নাজকে, তিনি অর্থকাগজকে রাগতস্বরে প্রশ্ন করে বলেন, আমাকে কেন বেছে নিলেন? কোম্পানিতে যান গিয়ে জানুন। নতুন এমডি নিয়োগ করা হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে তিনি বলেন আমাদের এমডি বদল হবে কেন? উনিতো আছেনই!

দ্বিতীয় প্রজন্মের জীবন বীমা কোম্পানি হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে মালিকদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকায় আজও কোম্পানিটি দেশের পুঁজি বাজারে যেতে সক্ষম হয়নি। মালিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। হোমল্যান্ড লাইফ গ্রাহকদের জমা করা ১০৪ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা তদন্তের প্রয়োজনে কোম্পানির আরো ৭ ধরনের তথ্য চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) । ২০ আগস্ট কোম্পানির মুখ্য নির্বাহীর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এসব তথ্য চাওয়া হয়। আগামী ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনকে এসব তথ্য পাঠাতে বলা হয়।

কোম্পানিটির অধিকাংশই সিলেটের উদ্যোক্তা। তাদের অনেকেই লন্ডনসহ দেশের বাইরে অবস্থান করেন। কেউ কেউ বিদেশে বসে কলকাঠি নাড়েন বলে অভিযোগ। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে নিয়ে মালিক যারা পরিচালনা পর্ষদে থাকেন তারা স্বাভাবিক কর্ম সম্পাদন করতে চাইলেও বাইরে অবস্থানরত মালিকেরা বিরোধিতা ও পরস্পরের বিরুদ্ধে মামলা করে আসছেন। কিছুদিন আগেও একটি পর্ষদ সভা চলার আগে এক দল বহিরাগত কোম্পানিতে এসে হামলা করে। পরে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ পুলিশ ডেকে এনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে।  

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, পর্ষদের বাইরে কোম্পানির প্রভাবশালী একটি মালিক পক্ষ বর্তমান পর্ষদ ও উর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে সরানোর জন্য সরকারি মহলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে আসছে।

অকা/বীখা/সন্ধ্যা, ২৩ আগস্ট, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 3 years আগে

Leave A Reply

Exit mobile version