অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বাংলাদেশের পুঁজি বাজার গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সংকটে নিমজ্জিত। সূচক কিংবা বাজার মূলধনের ওপর ভিত্তি করে সামান্য উত্থান দেখা গেলেও বাস্তবতা ভিন্ন। গত ১৬ বছরে বাজারের প্রকৃত মূল্য প্রায় ৩৮ শতাংশ কমে গেছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। মূল্যস্ফীতিকে সামঞ্জস্য করে হিসাব করলে দেখা যায়, যে প্রবৃদ্ধির কথা সূচকে প্রতিফলিত হয়, তা প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের পুঁজি সুরক্ষা বা বৃদ্ধির প্রতীক নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে বাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্য ক্ষতির আবহই বজায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে দীর্ঘস্থায়ী আস্থাহীনতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। প্রথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) থেকে শুরু করে সেকেন্ডারি মার্কেট পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে অসংখ্য অনিয়ম ও স্বচ্ছতার অভাব বিদ্যমান। অনেক কোম্পানি আর্থিক প্রতিবেদন বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে, কেউবা প্রতিবেদন প্রকাশেই ব্যর্থ হয়। এতে বাজারে তথ্যভিত্তিক বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না।
শুধু তাই নয়, শেয়ার বাজারে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা ও মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক কোম্পানি বাজারে প্রবেশের পরপরই দরপতনে পড়ে যায়, বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বিনিয়োগকারীরা বিপুল পরিমাণে পুঁজি হারান। দুর্বল আয়ক্ষমতা, স্বচ্ছতা বিবর্জিত অর্থনৈতিক কাঠামো এবং ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা এসব কোম্পানির মূল্যায়নে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।
সেকেন্ডারি মার্কেটেও ভয়ংকর চিত্র বিদ্যমান। বড় ধরনের শেয়ার কারসাজি প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী একাধিক বিও অ্যাকাউন্ট খুলে, দাম বাড়িয়ে এবং পরে বিক্রি করে বাজারে কৃত্রিম উত্থান ও পতনের মাধ্যমে লাখো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীকে ফাঁদে ফেলছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাঝে মধ্যে কিছু তদন্ত শুরু করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা শাস্তি থেকে রেহাই পায়।
একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় নিজেদের স্বার্থে বাজারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। তারা যখন বাজারে প্রবেশ করে, তখন দর বাড়ে; আবার তারা যখন সরে আসে, তখন দর পড়ে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ বিনিয়োগকারী।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, দেশের শেয়ার বাজারে পাঁচটি প্রধান সমস্যা এখনো বিদ্যমান: (১) মানহীন আইপিও, (২) আর্থিক প্রতিবেদনে অনিয়ম, (৩) বিও অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব, (৪) প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দায়িত্বহীনতা এবং (৫) সেকেন্ডারি মার্কেটে কারসাজি। এই পাঁচটি সমস্যার সমাধান ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে বাজারে আস্থা ফিরবে না।
প্রযুক্তি ব্যবহারের অভাবও বড় একটি বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। শেয়ার লেনদেন মনিটরিং, কারসাজি শনাক্তকরণ বা ডেটা অ্যানালাইটিকসের মতো আধুনিক প্রযুক্তি এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। ফলে অনিয়মকারীদের ধরতে বা প্রতিরোধ করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আর্থিক শিক্ষা বা সচেতনতার ক্ষেত্রেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
উল্লেখযোগ্য যে, দেশের পুঁজি বাজারে বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা প্রায় ৪০০-এর মতো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কোম্পানির শেয়ারদর একসময় কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে আবার ফেলে দেওয়া হয়। শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরে অনেক কোম্পানি বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) পর্যন্ত করে না, ডিভিডেন্ড দেয় না, বা ব্যবসা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। অথচ এই কোম্পানিগুলো বাজারে প্রবেশের সময় ভালো মুনাফার আশ্বাস দিয়েছিল।
আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো—বাজারে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে ধীরগতি। অনেক শেয়ার কারসাজির অভিযোগ উঠলেও তা বছরের পর বছর তদন্তে থাকে, অথবা মামলা হলেও বিচার শেষ হয় না। এতে অপরাধীদের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ভীতি তৈরি হয় না।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, শুধু সূচকের অল্প অগ্রগতি দেখিয়ে বাজারের উন্নয়ন হয় না। দরকার গভীর কাঠামোগত সংস্কার। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি ব্যবহার, আইন প্রয়োগের দক্ষতা এবং সব ধরনের বিনিয়োগকারীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, অর্থপাচার, এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—সবকিছুই শেয়ার বাজারের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
বর্তমানে অনেক বিনিয়োগকারী ছোট অঙ্কের পুঁজিতে বাজারে অংশগ্রহণ করছেন, যারা প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অথচ শেয়ার বাজারের লক্ষ্য হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি সংগ্রহের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যাতে দেশের শিল্প ও উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়।
সবশেষে বলা যায়, আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন পুঁজি বাজারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া সেই আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। বাজারে বাস্তব সংস্কার কার্যকর না হলে শেয়ার বাজার দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে। ●
অকা/পুঁবা/ই/ সকাল/২৮ মে, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 9 months আগে

