অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের ‘সবুজ সংকেত’ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে স্বস্তির বার্তা এনে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, যার প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। তবে তেহরানের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের ফলে সেই চাপ অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই ঘোষণার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশ এখন আগের মতো স্বাভাবিকভাবে ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল), এলএনজি এবং পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারবে। ফলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ফিরে আসার পাশাপাশি আমদানি ব্যয়ও কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এতদিন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছিল। বিশেষ করে এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুণ বা আড়াইগুণ বেশি দামে কিনতে হয়েছে। একইভাবে, বেসরকারি খাতের কোম্পানিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চমূল্যে এলপিজি আমদানি করতে বাধ্য হতে হয়েছে। এখন হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা পাওয়ায় এসব অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সাধারণত প্রতি মাসে ১ থেকে ২ লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানি করে থাকে, যা চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধিত হয়। এই তেল পরিবহনের দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। ইরানের নতুন অবস্থানের ফলে এই সরবরাহ চেইন আরও স্বাভাবিক ও কার্যকর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে, চীন ও ভারতের সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। চীনা জাহাজ চলাচলে বাধা না দেওয়ার ঘোষণার ফলে বাংলাদেশ আবারও নিয়মিতভাবে চীনের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে পরিশোধিত তেল আমদানির সুযোগ পাবে। পাশাপাশি, ভারতীয় জাহাজ না আটকানোর সিদ্ধান্তে ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হবে এবং প্রয়োজনে সেখান থেকে অতিরিক্ত আমদানির পথও খুলে যাবে।

তবে এখনও কিছু কারিগরি জটিলতা পুরোপুরি কাটেনি। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকান মালিকানাধীন কিছু জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের আগে ইরানের লিখিত অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে কিছু চালান বিলম্বিত হতে পারে। তবুও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক বেশি ইতিবাচক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মোট জ্বালানি আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে এবং এর বেশিরভাগই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। তাই এই রুটে স্থিতিশীলতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তারা এটিও মনে করেন, অঞ্চলের চলমান উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত না হলে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি থেকেই যাবে।

সব মিলিয়ে, ইরানের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তি নিয়ে এলেও, টেকসই সমাধানের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।

অকা/জ্বা/ই/সকাল/২৭ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 8 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version