অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বাংলাদেশের আর্থিক প্রযুক্তি খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরাপত্তা জোরদারে ইলেকট্রনিক মানি বা ই-মানি ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। খসড়া পর্যায়ে থাকা এই নীতিমালায় থাকছে ট্রাস্ট ফান্ড গঠন, মূলধন সংরক্ষণ, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া ও পরিচালন কাঠামোসহ একটি পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রক কাঠামোর নির্দেশনা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, “যত দ্রুত সম্ভব আমরা এই নীতিমালা বাস্তবায়নের দিকে যেতে চাই। তবে সময়সীমা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।”
এই উদ্যোগের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করেছে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’-এর ৬৪৫ কোটি টাকা সমপরিমাণ ই-মানি ইস্যুর ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি ওই ই-মানির বিপরীতে যথাযথ পরিমাণে নগদ মুদ্রা সংরক্ষণ করেনি, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃষ্টিতে ঝুঁকিপূর্ণ।
বর্তমানে ই-মানি ইস্যু করতে পারে ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে বাধ্যতামূলকভাবে তাদেরকে ইস্যুকৃত ই-মানির সমপরিমাণ নগদ অর্থ ব্যাংকে রাখতে হয়।
নতুন নীতিমালার আওতায় প্রতিটি ই-মানি ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানকে ‘ট্রাস্ট আইন ১৮৮২’-এর আওতায় একটি ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করতে হবে। এই ফান্ডে কেবল ইস্যুকৃত ই-মানির সমপরিমাণ অর্থ জমা থাকবে। প্রতিষ্ঠানটির মূলধন বা পরিচালন ব্যয় এই তহবিলের অংশ হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ জানিয়েছে, ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থের বিপরীতে ব্যাংক সুদ দিতে পারবে এবং সরকারি সিকিউরিটিজেও বিনিয়োগের সুযোগ থাকবে। এই আয়ের ৮০ শতাংশ ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান তাদের ই-মানি সেবার উন্নয়নে ব্যয় করতে পারবে। তবে এই অর্থ দিয়ে কর্মীদের বোনাস, প্রচারণা বা অন্য কোনো প্রশাসনিক খরচ চালানো যাবে না।
নীতিমালায় তিন ধরনের ই-মানি ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে— এক. পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি), যারা ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউট ছাড়া অন্যান্য ই-ওয়ালেট সুবিধা প্রদান করে; দুই. ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একটি ইউনিট হিসেবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান, যারা পূর্ণাঙ্গ ই-মানি ও ই-ওয়ালেট সুবিধা দিতে পারবে; তিন. স্বতন্ত্র করপোরেট প্রতিষ্ঠান, যারা নিজস্ব কাঠামোয় পূর্ণাঙ্গ ই-মানি ও ই-ওয়ালেট পরিষেবা দেবে।
প্রতিটি ধরনের জন্য আলাদা মূলধনের প্রয়োজনীয়তা থাকবে। একটি ই-মানি ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লাইসেন্স পেতে হলে ন্যূনতম ১০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন থাকতে হবে বলে খসড়া নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে।
প্রথমবারের মতো এই খাতে পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা আসছে। একই সঙ্গে সংঘ স্মারকে স্পষ্ট করে জানাতে হবে—ট্রাস্ট ও সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্টে থাকা ই-মানি অন্য কোনো তহবিলের সঙ্গে সংযুক্ত হবে না।
প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি অবকাঠামো, এজেন্ট ব্যবস্থাপনা ও আউটসোর্সিং কার্যক্রমেও মানসম্পন্ন নির্দেশনা থাকবে। প্রিপেইড কার্ড, ভ্রমণ কার্ড ও বিদেশি মুদ্রায় ই-মানির ব্যবস্থাপনাও এই নীতিমালার আওতায় আসবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ই-মানি পরিচালনায় ব্যাংক-নির্ভর (ব্যাংক-লেড) মডেল চালু থাকলেও, প্রস্তাবিত নীতিমালায় টেলিকম-নির্ভর (টেলকো-লেড) কিংবা প্রযুক্তিভিত্তিক (গুগল পে’র মতো) মডেল চালুর পথও উন্মুক্ত হতে পারে। এর ফলে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ সহজ হবে এবং ফিনটেক উদ্ভাবনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা আশা করছেন, এই নীতিমালার মাধ্যমে ই-মানি খাতে সুস্থ প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেন বাড়বে, নগদ নির্ভরতা কমবে এবং জালিয়াতির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। পাশাপাশি উদ্ভাবনী ফিনটেক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা আরও সহজ হবে, যার মাধ্যমে দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির গতি ত্বরান্বিত হবে। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/৭ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 8 months আগে

