অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
আসন্ন ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে দেশে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের মার্চ মাসের শুরু থেকেই প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের প্রথম ১৪ দিনেই দেশে এসেছে প্রায় ২ দশমিক ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২২০ কোটি ডলারের সমান। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৫ দশমিক ৭০ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান রোববার (১৫ মার্চ) বিকেলে সাংবাদিকদের কাছে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, সাধারণত বড় ধর্মীয় উৎসবকে সামনে রেখে প্রবাসীরা পরিবার-পরিজনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ পাঠান। ফলে ঈদের আগে রেমিট্যান্স প্রবাহে এমন বৃদ্ধি প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের মার্চ মাসের প্রথম ১৪ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল প্রায় ১ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। তুলনামূলকভাবে এ বছর একই সময়ে সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে বড় ধরনের বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও মনে করছেন, ঈদের কারণেই মূলত এই প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রবাসীরা সাধারণত উৎসবের সময় পরিবারের জন্য বেশি অর্থ পাঠান। ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্সের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যায়। তবে তিনি মনে করেন, ঈদ শেষ হওয়ার পর এই প্রবাহ কিছুটা কমে আসতে পারে, কারণ উৎসবকালীন অতিরিক্ত অর্থ পাঠানোর প্রবণতা তখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায়।
তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যাংকাররা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-ইসরাইল উত্তেজনা এবং সামরিক সংঘাত সেখানে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাজের পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে। যদি পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং প্রবাসীরা নিয়মিত কাজ করতে না পারেন, তাহলে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা কমে যেতে পারে।
বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো প্রবাসীদের পাঠানো ডলারের বিপরীতে তুলনামূলক বেশি দাম দিচ্ছে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের ডেপুটি ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, রোববার প্রবাসীদের পাঠানো প্রতি ডলারের জন্য ১২১ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ১২১ টাকা ৭৫ পয়সা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে আমদানি সংক্রান্ত এলসি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে প্রতি ডলারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১২১ টাকা ২০ পয়সা।
বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক ঘটনাবলিও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরাইলসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে একাধিক মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে ইরান। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়েও নতুন কিছু নীতিগত সংকেত এসেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে অর্থনীতিবিদদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখার দিকে গুরুত্ব দিতে চায়। এর ফলে বাজারে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, বাংলাদেশ ব্যাংক সহজে ডলার বিক্রি করবে না।
এই পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নিজেরাই বেশি দামে ডলার সংগ্রহের দিকে ঝুঁকছে। কারণ ভবিষ্যতে যদি নতুন বিনিয়োগ বাড়ে এবং আমদানির জন্য এলসি খোলার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তাহলে ব্যাংকগুলোর ডলারের চাহিদাও বাড়বে। এজন্যই অনেক ব্যাংক এখন থেকেই বেশি দামে ডলার কিনে মজুত করার চেষ্টা করছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ঈদকে সামনে রেখে রেমিট্যান্স প্রবাহে যে ইতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছে, তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, ডলারের বাজার এবং অর্থনৈতিক নীতির পরিবর্তন ভবিষ্যতে এই প্রবাহের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/দুপুর/১৬ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 10 hours আগে


