অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
অর্থনৈতিক চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার ও চাহিদার মন্দায় বিপর্যস্ত দেশের ব্যবসা ও শিল্পখাতকে কিছুটা পুনরুদ্ধারের সুযোগ দিতে নতুন নীতিগত শিথিলতা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ পরিশোধের কঠোর শর্তে আটকে থাকা অনেক প্রতিষ্ঠানকে কার্যক্রম সচল করার সুযোগ করে দিতে ডাউন পেমেন্ট বা এককালীন জমার ক্ষেত্রে কিস্তি সুবিধা এবং পূর্বঘোষিত নীতি সহায়তার সময়সীমা বাড়িয়ে নতুন সার্কুলার জারি করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতি ও ব্যাংকগুলোর আবেদনের ভিত্তিতে এই নমনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই—যেসব প্রতিষ্ঠান সাময়িক সংকটে পড়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের টিকে থাকার সুযোগ দেওয়া।
নতুন বিধান অনুযায়ী, যোগ্য ঋণগ্রহীতারা এখন নির্ধারিত ডাউন পেমেন্টের অর্থ একবারে না দিয়ে কিস্তিতে পরিশোধ করতে পারবেন। মোট অর্থের ৫০ শতাংশ অনুমোদনের সময় জমা দিতে হবে, আর বাকি অর্ধেক ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধের সুযোগ থাকবে। এর ফলে নগদ অর্থের চাপ কিছুটা কমবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ও সরবরাহ চেইন সচল রাখতে প্রয়োজনীয় কার্যকরী মূলধন ধরে রাখতে পারবে।
এছাড়া, যেসব প্রতিষ্ঠানের নীতি সহায়তা আগে অনুমোদিত হলেও যৌক্তিক কারণে তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি, সেসব ক্ষেত্রে ব্যাংক চাইলে অতিরিক্ত তিন মাস সময় বাড়াতে পারবে। সুদ সংক্রান্ত বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি নির্দিষ্ট হার বেঁধে না দিয়ে ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্ক ও বিদ্যমান নীতিমালার আলোকে সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রেখেছে। অর্থাৎ, কাঠামোগত নমনীয়তার ভেতরে ঝুঁকি মূল্যায়নের দায়িত্ব ব্যাংকগুলোর ওপরই থাকছে।
ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ ব্যক্তিরা এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। Mutual Trust Bank Limited-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, বর্তমান কঠিন প্রেক্ষাপটে এটি অসুস্থ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাস্তব সহায়তা হিসেবে কাজ করবে। একইভাবে Association of Bankers, Bangladesh-এর সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান বলেছেন, নির্বাচনের পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক করতে ব্যবসায়ীদের জন্য এই সিদ্ধান্ত ‘ব্রিদিং স্পেস’ তৈরি করবে—অর্থাৎ তাৎক্ষণিক চাপ থেকে কিছুটা মুক্তি দেবে।
তবে নীতিগত শিথিলতার পাশাপাশি ঝুঁকিও কম নয়। অভিজ্ঞ ব্যাংকার ও আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশ সতর্ক করেছেন, এই সুবিধা যেন ঢালাওভাবে প্রয়োগ না হয়। কারণ, অতীতে ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি’ হিসেবে চিহ্নিত কিছু ঋণগ্রহীতা নতুন শর্তের ফাঁক গলে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। প্রকৃত সংকটে থাকা ও পরিকল্পিতভাবে ঋণ না পরিশোধ করা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণে ব্যাংকগুলোর কঠোর যাচাই-বাছাই প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
প্রসঙ্গত, গত বছরের শুরুতে অনিচ্ছাকৃত কারণে খেলাপি হয়ে পড়া কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বাসনে একটি পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অফসাইট সুপারভিশন বিভাগের নির্বাহী পরিচালকের নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিটির তত্ত্বাবধানে বড় শিল্পগোষ্ঠীসহ প্রায় ৩০০টি কোম্পানি প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন বা পুনঃতফসিলের আবেদন করেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় ১৬ সেপ্টেম্বর বিশেষ ঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালা জারি করা হয়, যার সম্প্রসারিত রূপ হিসেবেই বর্তমান অতিরিক্ত শিথিলতা কার্যকর হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এই পদক্ষেপ অর্থনীতির জন্য দ্বিমুখী বার্তা বহন করছে। একদিকে এটি ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ দিচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে নৈতিক ঝুঁকি (moral hazard) বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি করছে। বাস্তব ফলাফল নির্ভর করবে—এই নমনীয়তা কতটা বাছাই করে এবং কতটা কঠোর নজরদারির মধ্যে প্রয়োগ করা হয় তার ওপর। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 2 hours আগে

