অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে এবং তা আগামী কয়েক বছরে আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশকে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এই বিপুল অঙ্কের দায় এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশের রাজস্ব কাঠামো নিজেই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৫৪ বছরে বাংলাদেশ মোট প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করেছে। অথচ এখন সেই মোট পরিশোধের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থ মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অর্থনীতির ওপর একটি বড় চাপ তৈরি হচ্ছে।

৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৭.২৮ বিলিয়ন ডলার, যা এক বছর আগেও ছিল ৬৮.৮২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে এবং তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে কিস্তি পরিশোধের দায়ও। গত অর্থবছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করা হলেও চলতি বছরে তা বেড়ে ৪.৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে এবং পরবর্তী বছরগুলোতে আরও বাড়তে বাড়তে ২০২৯-৩০ অর্থবছরে প্রায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

এই চাপ আরও জটিল হয়ে উঠছে দেশের রাজস্ব সংগ্রহের সীমাবদ্ধতার কারণে। বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা একই ধরনের অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় অত্যন্ত কম। ফলে সরকারের পক্ষে একদিকে উন্নয়ন ব্যয় বজায় রাখা এবং অন্যদিকে ঋণ পরিশোধ—দুই দিক সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকটের প্রভাব। কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় ও রাজস্ব সংগ্রহে চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে ঋণ পরিশোধের সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

এই পরিস্থিতির পেছনে বড় একটি কারণ হলো গত এক দশকে নেওয়া একাধিক মেগা প্রকল্প। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা মেট্রোরেল, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্প এবং বিমানবন্দর সম্প্রসারণসহ বড় বড় প্রকল্পগুলো বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন মূল ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে, যা চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশেষ করে রূপপুর প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ ২০২৮ সাল থেকে শুরু হবে, যেখানে বছরে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি পরিশোধ করতে হতে পারে। একইভাবে কোভিড-পরবর্তী সময়ে নেওয়া বাজেট সহায়তা ঋণের কিস্তিও এখন পরিশোধের পর্যায়ে এসেছে।

আরও একটি বড় সমস্যা হচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব। অনেক প্রকল্প সময়মতো শেষ না হওয়ায় প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কিছু প্রকল্প শেষ হলেও কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় সেগুলো থেকে কোনো আয় আসছে না। ফলে ঋণ পরিশোধের চাপ থাকলেও আয়ের উৎস তৈরি হচ্ছে না—যা অর্থনীতির জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে মোট ২৫.৯৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে, যার মধ্যে ১৮.৩৮ বিলিয়ন ডলার মূল এবং ৭.৬ বিলিয়ন ডলার সুদ। এই সময়ের মধ্যে ২০২৯-৩০ অর্থবছরকে সবচেয়ে চাপের বছর হিসেবে ধরা হচ্ছে।

তবে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বর্তমানে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের তুলনায় ঋণের অনুপাত এখনো সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। এমনকি সর্বোচ্চ চাপের বছরেও কয়েক মাসের রেমিট্যান্স দিয়েই ঋণ পরিশোধ সম্ভব—যা কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত দেয়।

তারপরও দীর্ঘমেয়াদে চ্যালেঞ্জ বড়। বর্তমান ঋণের হিসাব অনুযায়ী, নতুন ঋণ না নিলে সব ঋণ পরিশোধ করতে বাংলাদেশের প্রায় ৩৭ বছর সময় লাগবে, অর্থাৎ এই দায় দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলবে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কিছু মৌলিক সংস্কার জরুরি। প্রথমত, রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনা এবং আয় বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে প্রবাসী আয় বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজস্ব কাঠামো শক্তিশালী করা—কর ফাঁকি কমানো, করের আওতা বাড়ানো এবং কর ব্যবস্থায় সংস্কার আনা।

এছাড়া জ্বালানি খাতেও সঠিক পরিকল্পনা প্রয়োজন, কারণ শিল্প উৎপাদন এবং রপ্তানি বৃদ্ধির সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ সরাসরি সম্পর্কিত। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে, যা ঋণ পরিশোধ সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। সঠিক নীতি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে এই চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব, কিন্তু অব্যবস্থাপনা বা বিলম্ব পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

অকা/প্র/ই/দুপুর/১৫ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 12 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version