অর্থকাগজ প্রতিবেদন 
বাংলাদেশের নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে (এনবিএফআই) আরও কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক শেয়ার, ইক্যুইটি, বন্ড, ডিবেঞ্চার, মিউচুয়াল ফান্ড এবং ঐতিহ্যগত ঋণে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ক্ষতির বিপরীতে বাধ্যতামূলক প্রভিশনিংয়ের নতুন নিয়ম চালু করেছে। পূর্বে এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কেবল ঋণের শ্রেণিকরণের ভিত্তিতে প্রভিশন রাখা হতো। তবে নতুন নীতিমালায় বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে ২৫ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত প্রভিশন রাখতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক গত রোববার (৬ জুলাই ২০২৫) এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে সকল তফসিলি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে তাৎক্ষণিকভাবে নির্দেশনা কার্যকর করার নির্দেশ দেয়। এতে বলা হয়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিক থেকে নির্ধারিত বিন্যাসে প্রভিশন সংক্রান্ত তথ্যসমূহ প্রতিবেদন আকারে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ শুধু এনবিএফআই খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে জোরদার করবে না, বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধনী ভিত্তি ও স্বচ্ছতা বাড়াবে।
সার্কুলারে বলা হয়, তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার, ইক্যুইটি, বন্ড বা ডিবেঞ্চারে কোনো এনবিএফআই বিনিয়োগ করলে এবং বাজার মূল্য যদি ক্রয়মূল্যের নিচে নেমে আসে, তাহলে সেই পার্থক্যকে “বিনিয়োগ ক্ষতি” হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং একই পরিমাণ অর্থ প্রভিশন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। অর্থাৎ বাজার মূল্যের পতনে আর্থিক ঝুঁকি স্বীকার করে আগেভাগেই ক্ষতির জন্য আর্থিক সুরক্ষা রাখা হবে।
অন্যদিকে, অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানি—বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান এনবিএফআইয়ের সাবসিডিয়ারি বা অ্যাসোসিয়েট কোম্পানি হিসেবে যুক্ত—সে ক্ষেত্রে ইক্যুইটি বিনিয়োগের (অগ্রাধিকার শেয়ার ব্যতীত) মূল্যায়ন করতে হবে সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক বিবৃতিতে উল্লেখিত নিট সম্পদ মূল্যের (Net Asset Value) ভিত্তিতে। যদি এই নিট সম্পদ মূল্য ক্রয়মূল্যের চেয়ে কম হয়, তাহলে পার্থক্যটুকু ক্ষতি হিসেবে ধরে প্রভিশন করতে হবে।
নিরীক্ষা বা লাভজনকতা সংকটে থাকা কোম্পানিতেও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যেসব কোম্পানি টানা তিন বছর নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী প্রকাশ করেনি বা তিন বছর ধরে লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে বিনিয়োগ করা হলে পুরো ১০০ শতাংশ প্রভিশন রাখতে হবে। এ নির্দেশনা মূলত এমন ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চিত বিনিয়োগ থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে নেওয়া হয়েছে।
অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির অ-রূপান্তরযোগ্য অগ্রাধিকার শেয়ার, বন্ড বা ডিবেঞ্চারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও কঠোর ধারা প্রযোজ্য হবে। যদি কোনো আর্থিক বছরে সুদ বা লভ্যাংশ প্রদান না করা হয়, তবে প্রথম বছর শেষে ২৫ শতাংশ, দ্বিতীয় বছরে ৫০ শতাংশ এবং তৃতীয় বছরে ১০০ শতাংশ প্রভিশন করতে হবে। এমনকি নির্ধারিত মেয়াদ শেষে মূলধন ফেরত না এলে, বিনিয়োগের সম্পূর্ণ অর্থের বিপরীতে পরবর্তী আর্থিক বছরে ১০০ শতাংশ প্রভিশন রাখতে হবে।
সার্কুলারে আরও বলা হয়, তালিকাভুক্ত বা অ-তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ থেকে নগদে ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ না পাওয়া পর্যন্ত তা আয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ কেবল ঘোষিত নয়, প্রাপ্ত আয়কেই প্রকৃত আয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের বিনিয়োগ করতে হলে ‘Guidelines on Commercial Paper for Financial Institutions’ মেনে চলতে হবে, যাতে করে ফান্ডের প্রকৃত মূল্যমান ও ঝুঁকি সঠিকভাবে পরিমাপ করে প্রভিশনিং করা যায়।
এই নতুন নীতিমালাকে দেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করছেন ব্যাংকার ও নীতিনির্ধারকরা। এর ফলে শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা বাড়বে না, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির পাশাপাশি সার্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ এনবিএফআই খাতকে একটি সুগঠিত, স্বচ্ছ ও ঝুঁকিবিমুক্ত কাঠামোয় নিয়ে যেতে সহায়তা করবে। পূর্বের তুলনায় এটি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনাকে আরও অনেক পরিপক্ব, সুশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে। 
অকা/পুঁবা/ই/সকাল/৯ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 8 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version