অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সরবরাহ চুক্তিতে ‘ফোর্স মাজ্যুর’ ঘোষণা করায় বাংলাদেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পখাতে গ্যাস সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থা পেট্রোবাংলা দ্রুত বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক স্পট বাজার থেকে এলএনজি কেনার প্রস্তুতি শুরু করেছে।

সংঘাতের প্রভাব জ্বালানি সরবরাহে

সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতময় পরিস্থিতি তীব্র হওয়ার পর কাতারএনার্জি তাদের উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করে। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ করে এই প্রতিষ্ঠানটি। ফলে তাদের উৎপাদন বা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হয়। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এ পরিস্থিতি বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করে।

চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছরে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত মোট ১১৫টি এলএনজি কার্গোর মধ্যে প্রায় ৪০টি সরবরাহ করার কথা ছিল কাতারএনার্জির। কিন্তু ‘ফোর্স মাজ্যুর’ ঘোষণার ফলে এই সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার কার্যক্রম, রপ্তানি খাত এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।

সরকারের জরুরি পদক্ষেপ

পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় সরকার দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে। জ্বালানি খাতের কর্মকর্তাদের মতে, মার্চ মাসে সরবরাহ নিশ্চিত করতে অন্তত চারটি স্পট এলএনজি কার্গো সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্পট বাজার থেকে এসব গ্যাস কেনার মাধ্যমে সম্ভাব্য ঘাটতি আংশিকভাবে পূরণ করার চেষ্টা চলছে।

জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, স্পট বাজারে গ্যাসের দাম ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। উত্তেজনা বৃদ্ধির আগে এশীয় স্পট এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ৯ ডলারের নিচে ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে এশিয়ার স্পট সূচক জাপান কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩.৩৬৫ ডলারে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

ফোর্স মাজ্যুরের প্রভাব

ফোর্স মাজ্যুর হলো এমন একটি চুক্তিগত ধারা, যেখানে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মহামারির মতো নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পরিস্থিতিতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে তাদের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পেতে পারে। কাতারএনার্জি তাদের চিঠিতে জানিয়েছে, অঞ্চলের সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতি সরবরাহ কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

চিঠি পাওয়ার পরপরই পেট্রোবাংলা কাতারএনার্জির কাছে সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আরফানুল হক জানান, সরবরাহ অব্যাহত থাকবে কি না তা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং বিকল্প ব্যবস্থাও সক্রিয় করা হয়েছে।

সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী ঘিরেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই নৌপথ দিয়ে বিশ্ববাজারে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়। ইরান সেখানে অবরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়ায় জাহাজ চলাচলে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, যা জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও নাজুক করে তুলেছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে মোট সাতটি এলএনজি কার্গো বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা ছিল। এর মধ্যে ছয়টি কাতার থেকে আসার কথা এবং একটি আফ্রিকার দেশ অ্যাঙ্গোলা থেকে আসার কথা ছিল। ইতোমধ্যে চারটি কার্গো নিশ্চিত হলেও দুটি এখনও অনিশ্চিত রয়েছে।

বিকল্প পরিকল্পনা সক্রিয়

এই অনিশ্চয়তার মধ্যে পেট্রোবাংলা জরুরি পরিকল্পনা চালু করেছে। সম্ভাব্য ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের কাছ থেকে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বিশেষ করে ১৫ ও ১৮ মার্চ ডেলিভারির জন্য স্পট এলএনজি সরবরাহের কোটেশন চাওয়া হয়েছে, যেসব সময়ে কাতারের কার্গো আসার কথা ছিল।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী—যেমন ওকিউ ট্রেডিং এবং এক্সেলেরেট এনার্জি—তাদের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়েও যোগাযোগ করা হচ্ছে, কারণ তাদের অনেক চুক্তিই কাতারের উৎসের ওপর নির্ভরশীল।

ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ

বিশ্লেষকদের মতে, যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত থাকে, তাহলে বাংলাদেশকে দীর্ঘ সময় স্পট বাজারের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। এতে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এদিকে নীতিনির্ধারকরা এপ্রিল মাসের সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। চলমান সংকটের প্রভাব আগামী মাসের চালানেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পেট্রোবাংলা ইতোমধ্যে সব সরবরাহকারীর কাছে চিঠি পাঠিয়ে এপ্রিল মাসে সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে তাদের অবস্থান জানতে চেয়েছে।

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতার এই সময় বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও বহুমুখী করা জরুরি। অন্যথায় বড় সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।

অকা/জ্বা/ই/সকাল/৫ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 4 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version