অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

দেশের পোল্ট্রি খাতে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে—যেখানে প্রান্তিক খামারিরা উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে লোকসানে মুরগি বিক্রি করছেন, সেখানে একই পণ্য বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে দ্বিগুণ দামে। ফলে একদিকে খামারিরা আর্থিক সংকটে পড়ছেন, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তাদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত মূল্য। মাঝখানে লাভবান হচ্ছে একটি অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী চক্র—এমন অভিযোগই উঠে এসেছে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে।

বর্তমানে খামার পর্যায়ে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ প্রায় ১৪৫ টাকা হলেও, বাজারে সেই মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকার আশপাশে। অর্থাৎ, উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যবর্তী ধাপে বিশাল দামের ফারাক তৈরি হয়েছে। একইভাবে সোনালি মুরগির দামও হঠাৎ করে কেজিতে প্রায় ১০০ টাকা বেড়ে ৪৩০ টাকায় পৌঁছেছে। দেশি মুরগির ক্ষেত্রেও একই চিত্র—দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দাম ৬৫০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০০ টাকায়।

টাঙ্গাইলের ভূঁঞাপুর উপজেলার খামারি আলমগীর হোসেন, যিনি দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে খামার পরিচালনা করছেন, জানান যে বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ পড়ে প্রায় ১০.৫ থেকে ১১ টাকা। অথচ অনেক সময় পাইকারি বাজারে তা বিক্রি করতে হয় মাত্র ৭.৫ থেকে ৮.৫ টাকায়। একইভাবে ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রেও উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন খামারিরা। তাঁর মতে, গত এক বছরে পোল্ট্রি খাদ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, যা খামারিদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার খামারি লোকসান গুনছেন, কিন্তু বাজারে সেই প্রভাব উল্টোভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে—দাম বাড়ছে ক্রেতার জন্য, কিন্তু উৎপাদক পাচ্ছেন না ন্যায্য মূল্য।

রাজধানীর নয়াবাজারের একজন ক্রেতা সাঈদ আল মামুন জানান, ঈদের আগেও বাজারে এমন অস্থিরতা ছিল না। এখন হঠাৎ করে সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে গেছে, যা সাধারণ পরিবারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, আগে অন্তত পরিবারের জন্য কিছু মাছ-মাংস কেনা যেত, কিন্তু এখন সেই সামর্থ্যও অনেকের নেই।

খুচরা বিক্রেতাদের মতে, পাইকারি বাজারেই মুরগির দাম বেড়ে গেছে, যার প্রভাব খুচরা পর্যায়ে পড়ছে। বিক্রেতা আমিনুল জানান, প্রতি কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, ফলে বাধ্য হয়েই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। বিশেষ করে সোনালি মুরগির ক্ষেত্রে পাইকারি দামই ৭০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

পাইকারি বাজারের বিক্রেতারা আবার এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে পরিবহন সংকট ও জ্বালানি সমস্যাকে দায়ী করছেন। কাপ্তান বাজারের ব্যবসায়ী সোহেলের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়েছে, ফলে পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থাও কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারদরে।

অন্যদিকে ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষায় কাজ করা কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। তিনি বলেন, ব্রয়লার মুরগি সাধারণ মানুষের জন্য প্রধান আমিষের উৎস, কিন্তু এখানেও কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে। কেন দাম বাড়ছে এবং কোথায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কেউ যেন অবৈধভাবে পণ্যের দাম বাড়াতে না পারে, সেজন্য বাজার তদারকি জোরদার করা জরুরি।

এদিকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। খামার, পাইকারি ও খুচরা—তিন স্তরের মূল্য বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে কোথায় অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে এবং কারা এর জন্য দায়ী।

সার্বিকভাবে পরিস্থিতি ইঙ্গিত করছে যে, বাজার ব্যবস্থাপনায় কোথাও বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। উৎপাদক ক্ষতিগ্রস্ত, ভোক্তা চাপে, অথচ মধ্যবর্তী কোনো গোষ্ঠী লাভবান হচ্ছে—এই চক্র ভাঙতে কার্যকর নজরদারি ও নীতিগত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

অকা/প্র/ই/দুপুর/১১ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 3 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version