অর্থকাগজ প্রতিবেদন

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের সিংহভাগই কয়েকটি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। গত ৩০ জুন পর্যন্ত এ খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৫৪ শতাংশেরও বেশি কেন্দ্রীভূত হয় মাত্র পাঁচটি ব্যাংকে। আর ১০ ব্যাংকের কাছে খেলাপি ঋণ রয়েছে প্রায় সাড়ে ৭৪ শতাংশ। এছাড়া এককভাবে ১১টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ২০ শতাংশের বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের জুনভিত্তিক আর্থিক স্থিতিশীলতা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে গতকাল সোমবার এসব তথ্য উঠে এসেছে। তবে প্রতিবেদনে ব্যাংকগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতে শীর্ষ তিন ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে অন্তত ১৮টি ব্যাংক ন্যূনতম প্রয়োজনীয় ক্যাপিটাল টু রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেট রেশিও (সিআরএআর) সংরক্ষণে ব্যর্থ হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ধারাবাহিক খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতে ব্যাংক খাতে সম্পদের মান ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। এতে দিন দিন ঝুঁকির মাত্রাও বাড়ছে।
প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হারের দিক থেকে শীর্ষে থাকা ব্যাংকগুলোর মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে জুন- এ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২৯ হাজার ৯৭ কোটি টাকা। এতে জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় দুই লাখ ১১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা, যা এ খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদন বলছে, গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশ।

জানা গেছে, গত জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণের শীর্ষে থাকা পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ও একটি বেসরকারি ব্যাংক। এগুলো হলো- সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও ন্যাশনাল ব্যাংক। শীর্ষ এই পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ ১৪ হাজার ২১৩ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের ৫৪ দশমিক ০৩ শতাংশ। প্রাপ্ত তথ্যমতে, এ সময়ে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকে ৪৮ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণের ৬৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২১ হাজার ৩২৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অগ্রণী ব্যাংকের, যা ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

তৃতীয় অবস্থানে থাকা বেসরকারি ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ২০ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা বা ৪৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এ সময়ে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ১৩ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা, যা তাদের মোট বিতরণ করা ঋণের ১৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। আর রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ১০ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা বা ২৩ দশমিক ০১ শতাংশ। তবে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে এই পাঁচ ব্যাংকের চারটিই শীর্ষ তালিকায় আছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

আলোচ্য প্রতিবেদনে শীর্ষ ১১টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ২০ শতাংশের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই ৯ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ২০ থেকে ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের হারে শীর্ষে রয়েছে বিদেশি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। ব্যাংকটি বিতরণ করা ঋণের ৯৬ দশমিক ০৮ শতাংশই খেলাপি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৮৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। আর ৮৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে চতুর্থ প্রজšে§র পদ্মা ব্যাংকে।

এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের ৬৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ, জনতা ব্যাংকের ৫২ দশমিক ৫৫ শতাংশ, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৫৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৪৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ৪২ দশমিক ৩০ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংকের ৩০ দশমিক ৫৯ শতাংশ, এবি ব্যাংকের ৩০ দশমিক ৯৫ শতাংশ ও রূপালী ব্যাংকের ২৩ দশমিক ০১ শতাংশ খেলাপি ঋণ ছিল।
প্রতিবেদন বলছে, গত জুন পর্যন্ত দুই শতাংশের কম খেলাপি ঋণ ছিল আটটি ব্যাংকে। এছাড়া দুই শতাংশের বেশি কিন্তু তিন শতাংশের কম খেলাপি ঋণ ছিল চারটি ব্যাংকে। এছাড়া তিন শতাংশের বেশি কিন্তু পাঁচ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ ১৫টি ব্যাংকে, পাঁচ শতাংশের বেশি কিন্তু ১০ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ ১৯টি ব্যাংকে, ১০ শতাংশের বেশি কিন্তু ১৫ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ তিনটি ব্যাংকে এবং ১৫ শতাংশের বেশি কিন্তু ২০ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ একটি ব্যাংকে।

শীর্ষ তিন ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে ১৬ ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে পড়বে। আন্তর্জাতিক নীতিমালার আলোকে ব্যাংকগুলোকে মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাসেল-৩ নীতিমালার আলোকে ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশ অথবা ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে যেটি বেশি, সে পরিমাণ মূলধন রাখতে হচ্ছে। কোনো ব্যাংক এ পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হলে মূলধন ঘাটতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রতিবেদন বলছে, গত জুনের হিসাবে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ১১টি ব্যাংক ন্যূনতম ১০ শতাংশ হারে সিআরএআর রাখতে পারেনি। বাকি ৫০টি ব্যাংকের ওপর পরিচালিত অভিঘাত নির্ণয় করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেখতে পায়, এ ব্যাংকগুলোর শীর্ষ তিন গ্রহীতা খেলাপি হলে ১৮টি ব্যাংক ১০ শতাংশ সিআরএআর সংরক্ষণ করতে পারবে না। এ ছাড়া ওই সময় পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলোয় যে পরিমাণ খেলাপি ঋণ রয়েছে, তা যদি আরও তিন শতাংশ বাড়ে, তা হলে আরও পাঁচটি ব্যাংক ন্যূনতম ১০ শতাংশ সিআরএআর সংরক্ষণে ব্যর্থ হবে।

প্রতিবেদন আরও দেখা যায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল এক লাখ ১৪ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয় ৭৯ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। ফলে প্রভিশন সংরক্ষণে ঘাটতি ছিল ২৪ হাজার ৮১১ কোটি টাকা।

অকা/ব্যাংখা/ই/ সকাল, ১০ ডিসেম্বর ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ



 

সর্বশেষ হালনাগাদ 1 year আগে

Leave A Reply

Exit mobile version