অর্থকাগজ প্রতিবেদন

বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারাবাহিক নীতিগত সহায়তা, ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ এবং খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণখেলাপির পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৪৪টির খেলাপি ঋণ বেড়েছে, যা ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে একসঙ্গে এত সংখ্যক ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বিরল ঘটনা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে এই ৪৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। ফলে মার্চ ২০২৬ শেষে দেশের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এই বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। বিশেষ করে গত বছরের শেষ প্রান্তিকে অনেক ব্যাংক বিভিন্ন সুবিধা ব্যবহার করে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল করতে সক্ষম হয়েছিল। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিবিড় পরিদর্শন ও নিরীক্ষায় বহু গোপন খেলাপি ঋণ শনাক্ত হওয়ায় প্রকৃত অবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব, উচ্চ সুদহার, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে তারল্য সংকটের কারণে ঋণ আদায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি আরও নাজুক

রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের মধ্যে চারটির খেলাপি ঋণ গত তিন মাসে আরও বেড়েছে। এই সময়ে সরকারি ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণ ৩ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তাদের মোট ঋণের প্রায় ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশই এখন খেলাপি।

সবচেয়ে বেশি অবনতি হয়েছে জনতা ব্যাংকে। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ তিন মাসে ২ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা বেড়ে প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা তাদের মোট ঋণের প্রায় ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকটির বিতরণকৃত প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৭৪ টাকাই খেলাপি অবস্থায় রয়েছে।

এ ছাড়া রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৬৮৮ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ২৮৪ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের ১১ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

সবচেয়ে বেশি চাপ বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে বেসরকারি ব্যাংক খাতে। মার্চ প্রান্তিক শেষে ৪৩টি বেসরকারি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ ২৬ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা বেড়ে ৪ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই খাতের মোট ঋণের ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ এখন খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ৩৪টিতেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, কেবল দুর্বল বা সংকটে থাকা ব্যাংক নয়, বরং আর্থিকভাবে তুলনামূলক শক্তিশালী ও সুপরিচালিত ব্যাংকগুলোর মধ্যেও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে আইএফআইসি ব্যাংক। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ এক প্রান্তিকেই ৪ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা বেড়ে ২৮ হাজার ১৭৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের প্রায় ৬৩ শতাংশ।

এরপর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংকের ৩ হাজার ৩২০ কোটি টাকা এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ২ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা।

ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২ হাজার ১৬২ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা এবং এবি ব্যাংকের ১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

শক্তিশালী ব্যাংকগুলোও রেহাই পায়নি

সাধারণত মূলধন পর্যাপ্ততা, মুনাফা ও সুশাসনের দিক থেকে ভালো অবস্থানে থাকা ব্যাংকগুলোতেও এবার খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে।

মার্চ প্রান্তিকে সিটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪২২ কোটি টাকা, ব্যাংক এশিয়ার ৬৬২ কোটি টাকা, উত্তরা ব্যাংকের ৪০৬ কোটি টাকা এবং প্রাইম ব্যাংকের ৩৯২ কোটি টাকা বেড়েছে। বিদেশি মালিকানাধীন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশেও খেলাপি ঋণ ২১৬ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ ছাড়া আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯১৭ কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৭২৬ কোটি টাকা, ঢাকা ব্যাংকের ৪৫৩ কোটি টাকা, ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ২১৮ কোটি টাকা এবং ইস্টার্ন ব্যাংকের ২১১ কোটি টাকা বেড়েছে।

বিশেষায়িত ও বিদেশি ব্যাংকেও ঋণঝুঁকি বাড়ছে

কেবল বাণিজ্যিক ব্যাংক নয়, বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোও খেলাপি ঋণের চাপ থেকে মুক্ত নয়। জানুয়ারি-মার্চ সময়ে কৃষি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩৯৬ কোটি টাকা, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ১৯৯ কোটি টাকা এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ৩৪ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যেও খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এইচএসবিসি বাংলাদেশ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশ এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার স্থানীয় কার্যক্রমে ঋণঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।

কেন বাড়ছে খেলাপি ঋণ?

ব্যাংকারদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্যবসা ও শিল্পখাত নানা ধরনের চাপে রয়েছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং বিনিয়োগে ধীরগতির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের নগদ প্রবাহ সংকুচিত হয়েছে। ফলে তাদের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং অনেক বড় ঋণগ্রহীতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল আলম খান খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ তুলে ধরেছেন। তার মতে, কঠোর তদারকির কারণে আগে আড়ালে থাকা অনেক খেলাপি ঋণ এখন প্রকাশ্যে আসছে। একই সঙ্গে ঋণ স্থগিতাদেশ ও বিলম্বে পরিশোধের বিশেষ সুবিধার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবগুলো পুনরায় শ্রেণিকরণ করতে হচ্ছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের সুদহার বৃদ্ধি, বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নগদ প্রবাহে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি ঋণ মূল্যায়ন, জামানত ব্যবস্থাপনা এবং করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতা সমস্যাকে আরও জটিল করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণের এই ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি শুধু ব্যাংকগুলোর মুনাফা ও মূলধনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং পুরো আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দ্রুত ঋণ পুনরুদ্ধার এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর কার্যকর সংস্কার ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হবে।

সর্বশেষ হালনাগাদ 2 days আগে

Leave A Reply

Exit mobile version