অর্থকাগজ প্রতিবেদন

দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কয়েক সপ্তাহের স্থিতিশীলতার পর আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে মার্কিন ডলারের দাম। ব্যাংকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, আমদানি দায় পরিশোধের চাপ বৃদ্ধি, প্রবাসী আয় কমে যাওয়া, রপ্তানি আয়ের গতি শ্লথ হওয়া এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনার পর বাজারের প্রত্যাশায় পরিবর্তন—এই চারটি কারণ একসঙ্গে কাজ করায় ডলার বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।

গত তিন থেকে চার সপ্তাহ ধরে আন্তঃব্যাংক বাজার এবং রেমিট্যান্স সংগ্রহ—উভয় ক্ষেত্রেই ডলারের দর ঊর্ধ্বমুখী। গত ২০ জুলাই কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৭৫ পয়সা দরে প্রবাসী আয়ের ডলার কিনেছে, যা জুলাইয়ের শুরুর তুলনায় প্রায় ১০ পয়সা বেশি। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের বিনিময় হার এক সপ্তাহে ৭৫ পয়সা বেড়ে ১২৩ টাকা ৬০ পয়সায় পৌঁছেছে।

যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘদিন আন্তঃব্যাংক ডলারের রেফারেন্স রেট ১২২ টাকা ৮৫ পয়সায় ধরে রেখেছিল, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বাস্তবে ওই দরে খুব কম লেনদেনই হয়েছে। বাজারে প্রকৃত চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে ডলারের দাম দীর্ঘদিন ধরেই কিছুটা বেশি ছিল।

আমদানি দায়ে বাড়তি চাপ

ডলার বাজারে চাপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে আমদানি বিল পরিশোধের উচ্চ চাপ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুন মাসেই ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি আমদানি দায় বা এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি খাতের সার, জ্বালানি তেল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বিল পরিশোধে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়েছে।

ব্যাংকারদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণত এলসি খোলার এক থেকে তিন মাসের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করতে হয়। ফলে মার্চ ও এপ্রিল মাসে খোলা অনেক এলসির দায় জুন ও জুলাইয়ে এসে একসঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে। পাশাপাশি রমজান মাসে খোলা ইউপিএএস (Usance Payable at Sight) এলসির বড় অংশের অর্থও জুন ও চলতি জুলাই মাসে পরিশোধ হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা আরও বাড়িয়েছে।

রেমিট্যান্স ও রফতানির গতি কমেছে

ডলারের সরবরাহের দিকেও চাপ তৈরি হয়েছে। জুন মাসে গত আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রবাসী আয় দেশে এসেছে। ওই মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের কয়েক মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

অন্যদিকে রফতানি আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়লেও আমদানি ব্যয় উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৭০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে সামান্য বেশি। অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রার বহির্গমন উচ্চ পর্যায়ে থাকলেও সেই অনুপাতে ডলার প্রবাহ বাড়েনি।

প্রতিযোগিতায় অস্থিরতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, বাজারে ডলারের দামের ওপর আরেকটি চাপ সৃষ্টি করছে কিছু ব্যাংকের আগ্রাসী ডলার সংগ্রহ নীতি। প্রবাসী আয়ের ডলার সংগ্রহে তারা এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোকে তুলনামূলক বেশি দাম দিচ্ছে। পরে সরকারি এলসি বা অন্যান্য জরুরি দায় পরিশোধের জন্য কম দামে সেই ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে।

ট্রেজারি প্রধানদের ভাষ্য, কয়েকটি ব্যাংকের এই প্রতিযোগিতামূলক আচরণ পুরো বাজারের মূল্য কাঠামোকে অস্থির করে তুলছে। তাদের মতে, কোনো ব্যাংক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ করে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে কি না, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

আইএমএফ আলোচনার প্রভাব

সাম্প্রতিক সময়ে আইএমএফের সঙ্গে সরকারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার পর বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে প্রত্যাশার পরিবর্তনও ডলারের দামে প্রভাব ফেলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নিলামের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার কেনার দর কেন একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা হচ্ছে, সে বিষয়ে আইএমএফ প্রশ্ন তুলেছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগের নির্ধারিত রেফারেন্স রেট প্রকাশের পরিবর্তে নিজেদের ওয়েবসাইটে চলতি আন্তঃব্যাংক বিনিময় হার প্রকাশ শুরু করেছে। ফলে বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছে যে ডলারের বিনিময় হার ভবিষ্যতে আরও বেশি বাজারনির্ভর হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলমান থাকায় বর্তমানে ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনানুষ্ঠানিকভাবে আগের মতো হস্তক্ষেপ করছে না। ফলে বাজারের চাহিদা ও সরবরাহই এখন বিনিময় হার নির্ধারণে তুলনামূলক বেশি ভূমিকা রাখছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানি দায় পরিশোধের চাপ কিছুটা কমা, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং রপ্তানি আয় শক্তিশালী না হওয়া পর্যন্ত ডলার বাজারে চাপ পুরোপুরি কমার সম্ভাবনা কম। তাই আগামী কয়েক মাসে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের গতিপ্রকৃতি অনেকটাই নির্ভর করবে রেমিট্যান্স প্রবাহ, রপ্তানি আয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত অবস্থানের ওপর।

সর্বশেষ হালনাগাদ 10 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version