অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ পাওয়ার শর্ত পূরণে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে এবং এর অংশ হিসেবে সঞ্চয়পত্রের সুদহার হ্রাস করা হয়েছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতির চাপের মুখে থাকা সাধারণ জনগণের মধ্যে সঞ্চয়পত্র ভাঙিয়ে ফেলার প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, পেনশনার এবং ঝুঁকিপূর্ণ বয়সী নাগরিকদের কাছে এক সময় নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে পরিচিত সঞ্চয়পত্র এখন আর আগের মতো আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে না।
সঞ্চয়পত্রের সুদহার হ্রাস পাওয়ায় অনেকেই এখন তাদের দৈনন্দিন খরচের জন্য সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে বাধ্য হচ্ছেন। জীবনযাত্রার ব্যয়নির্বাহে যেখানে আগের মতো আয়ের সঙ্গে খরচের ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে, সেখানে সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানো আরও বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে। অথচ বিগত কয়েক বছর ধরে সরকার এই মাধ্যম থেকে অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণে একাধিকবার লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৫ হাজার কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৮ হাজার কোটি টাকায়, ২০২৪-২৫ সালে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও কমিয়ে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকেরা বলছেন, সরকার চলতি অর্থবছরে ব্যয়ের আকার না বাড়িয়ে একটি সংকোচনমূলক বাজেট প্রণয়ন করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। এর সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের সুদহার হ্রাস একটি সাংঘর্ষিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। কারণ এতে করে জনগণ এখন বেশি সুদ পাওয়া ব্যাংকে অর্থ জমাতে আগ্রহী হবে, কিন্তু সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে ঘাটতি বাজেট পূরণে পর্যাপ্ত অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে না। ফলে সরকারের ঋণ নির্ভরতা আরও বেশি করে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে সংকোচন তৈরি করবে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এই প্রসঙ্গে সাবেক সিনিয়র অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ মন্তব্য করেছেন, সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমিয়ে দিলে মধ্যবিত্ত মানুষের সংকট আরও বাড়বে। কারণ অনেকেই সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভর করে সংসার চালান। তার মতে, ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে বরং সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকারের ঋণ সংগ্রহ করা উচিত। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরী বলেন, সরকারকে আইএমএফ-এর শর্ত পূরণ করতে গিয়ে বাস্তবতা বিবেচনা না করেই সঞ্চয়পত্রের সুদ কমাতে হয়েছে। ফলে বয়স্ক, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি এক ধরনের বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। তিনি বলেন, আগে প্রাইজবন্ড কিংবা সঞ্চয়পত্রের প্রতি মানুষের একটি আস্থা ছিল। এখন নানা বিধিনিষেধ ও সুদহার কমার ফলে সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে সঞ্চয়পত্রের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে মানুষ।
আইএমএফ-এর শর্ত অনুযায়ী, সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের সর্বোচ্চ এক-চতুর্থাংশ সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া যাবে এবং এর সুদহার বাজারভিত্তিক হতে হবে। অর্থাৎ সঞ্চয়পত্রের সুদ নির্ধারণ করা হবে সরকারি ট্রেজারি বিলের ছয় মাসের গড় সুদহারের ভিত্তিতে। যদি ট্রেজারি বিলের সুদহার বাড়ে, তবে সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাড়বে এবং কমলে সঞ্চয়পত্রের সুদহারও কমবে। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে ট্রেজারি বিলের সুদহার কমে যাওয়ায় সঞ্চয়পত্রের সুদহারও কমিয়ে আনা হয়েছে। এখন সাড়ে সাত লাখ টাকার নিচে বিনিয়োগকারীদের জন্য সুদহার ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং এর ওপরে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই হার আরও কমিয়ে ৬ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইএমএফ সঞ্চয়পত্রকে সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি দায় হিসেবে গণ্য করছে, কারণ প্রতিবছর এর বিপরীতে বড় অঙ্কের সুদ সরকারকে পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সঞ্চয়পত্র বহু বছর ধরে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অংশ হিসেবে কাজ করেছে। এর মাধ্যমে বয়স্ক ও স্বল্প আয়ের মানুষ তুলনামূলক নিরাপদ ও স্থিতিশীল সঞ্চয়ের সুযোগ পেতেন। এখন সুদহার ও বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে দেওয়ায় এই সুবিধা হ্রাস পাচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী আরও সংকটে পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঞ্চয়পত্রে উচ্চ সুদহার বজায় থাকলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে বন্ড মার্কেটে। বর্তমানে সঞ্চয়পত্রে বেশি মুনাফা পাওয়ার সুযোগ থাকায় বেসরকারি কোম্পানিগুলো বাজারে বন্ড ছাড়তে অনাগ্রহী। ফলে পুঁজিবাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি হচ্ছে না। অথচ একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য সুস্থ বন্ড মার্কেট থাকা অপরিহার্য। তাই আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় সঞ্চয়পত্রের সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, সঞ্চয়পত্রে আকর্ষণ কমিয়ে শুধু বন্ড মার্কেট শক্তিশালী হবে এমনটি ভাবলে তা একপাক্ষিক হবে। কারণ যারা সঞ্চয়পত্র কিনেন, তারা মূলত নিরাপত্তা খুঁজে পান এতে। ঝুঁকিপূর্ণ বাজার বা ভিন্নতর বিনিয়োগমাধ্যম তাদের জন্য উপযুক্ত নয়। তাই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত, বয়স্ক, পেনশনার এবং নারী গৃহিণীদের জন্য বিকল্প ও লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, একদিকে সরকার আইএমএফ-এর শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতায় পড়েছে, অন্যদিকে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর সঞ্চয় ও সামাজিক নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতায় সরকার যদি সঞ্চয়পত্র থেকে সম্পূর্ণভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে একদিকে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়বে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে। ফলে এখনই সময়, সরকার যেন ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা গ্রহণ করে—যেখানে আর্থিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জনগণের সঞ্চয়ের নিরাপত্তাও রক্ষা পায়। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/৬ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 8 months আগে

