অর্থকাগজ প্রতিবেদন

বাংলাদেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল ব্যবস্থাপনা, উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন সংকট এবং তারল্য ঘাটতির যে সমস্যা জমে উঠেছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তাদের হাতে শেষবারের মতো তিন মাস সময় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এই সময়ের মধ্যে নির্ধারিত সংস্কারমূলক শর্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে রেজল্যুশন বা অবসায়ন কার্যক্রম শুরু করা হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপকে দেশের আর্থিক খাতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল হয়ে পড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে কঠোর অবস্থানের স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

তিন মাসের সময় পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি) লিমিটেড এবং প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে পৃথক চিঠির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শর্ত অনুযায়ী, আগামী তিন মাসের মধ্যে পরিচালনা পর্ষদ ও স্পন্সর শেয়ারহোল্ডারদের মাধ্যমে নতুন মূলধন সংগ্রহ করে আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত তারল্য নিশ্চিত করা, প্রয়োজন হলে সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে নগদ অর্থের সংস্থান করা, বকেয়া ঋণ আদায় জোরদার করা, খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা এবং আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধে কার্যকর অগ্রগতি দেখাতে হবে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগে প্রতিবেদন আকারে জমা দিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চারটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সূচকই গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিআইএফসি-এর মোট ঋণের ৯৭ দশমিক ৩০ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের পরিমাণ ৪৮০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেডের খেলাপি ঋণ ৯৮৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির মোট লোকসান ৯৪১ কোটি টাকা।

অন্যদিকে জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডের খেলাপি ঋণ ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৫৯ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির লোকসান ৩৩৯ কোটি টাকা। একইভাবে প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের খেলাপি ঋণ ৫৩৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৭৮ শতাংশ; প্রতিষ্ঠানটির মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩৫১ কোটি টাকা।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর দুর্বল করপোরেট সুশাসন, ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণ, ঋণ পুনরুদ্ধারে ব্যর্থতা, পর্যাপ্ত মূলধনের অভাব এবং কার্যকর তদারকির ঘাটতির কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ভিত্তি ক্রমেই দুর্বল হয়েছে। এর ফলে শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাজারো আমানতকারী এবং সামগ্রিকভাবে আর্থিক খাতের প্রতি জনআস্থাও কমেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রথমবারের মতো সমস্যাগ্রস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে সময়সীমা বেঁধে দিয়ে সংস্কারের সুযোগ তৈরি করেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শর্ত পূরণ করা গেলে প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাবে। অন্যদিকে ব্যর্থ হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন, একীভূতকরণ, সম্পদ ও দায় স্থানান্তর অথবা প্রয়োজন হলে অবসায়নের মতো পদক্ষেপ নিতে পারবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অনির্দিষ্টকাল টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক। তবে রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ, বাজারে আস্থা বজায় রাখা এবং পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাখার ওপর।

এখন নজর থাকবে আগামী তিন মাসের দিকে। এই সময়ের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে চারটি প্রতিষ্ঠান নিজেদের আর্থিক ভিত্তি পুনর্গঠন করে টিকে থাকতে পারবে, নাকি বাংলাদেশের আর্থিক খাতে নতুন আইনের অধীনে রেজল্যুশনের প্রথম বড় উদাহরণ হয়ে উঠবে।

সর্বশেষ হালনাগাদ 17 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version