অর্থকাগজ প্রতিবেদন

রফতানিমুখী শিল্পখাতে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা নিশ্চিত করতে চালু থাকা বন্ড ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে ব্যাপক ডিজিটাল রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। শতভাগ বন্ড অটোমেশনের লক্ষ্যে ইউটিলাইজেশন পারমিট (ইউপি) কার্যক্রম অনলাইনে আনা হয়েছে। পাশাপাশি বন্ড লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ সেবা এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে সেবা গ্রহণের সময় কমেছে, প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা বেড়েছে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা চালু হলেও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও শুল্ক ফাঁকির সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান এখনো শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল নির্ধারিত উৎপাদন কার্যক্রমে ব্যবহার না করে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে বা খোলা বাজারে বিক্রি করছে। এর ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি স্থানীয় শিল্প ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতও ক্ষতির মুখে পড়ছে।

ব্যবসায়ী ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকাশিত তথ্যের বাইরে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের প্রকৃত পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতে পারে। তারা বলছেন, একদিকে অসাধু ব্যবসায়ীরা অবৈধ সুবিধা নিচ্ছে, অন্যদিকে বৈধ উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। এতে বাজারে অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তারা বলছেন, কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় জনবল, যানবাহন এবং লজিস্টিক সহায়তার ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকার দুই বন্ড কমিশনারেটের আওতায় বর্তমানে চার হাজারের বেশি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা পোশাকশিল্পের জন্য ফেব্রিক্স, সুতা, রাসায়নিক, রং, প্যাকেজিং উপকরণ, জিপার, বাটন, হ্যাঙ্গার ও ইলাস্টিকসহ বিভিন্ন কাঁচামাল শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করে থাকে। কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তদারকির জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নেই।

তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটে অনুমোদিত ২২০টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। একই ধরনের সংকট রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটেও। ফলে নিয়মিত পরিদর্শন, অডিট ও প্রিভেন্টিভ কার্যক্রম পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, সীমিত জনবল ও সরঞ্জাম নিয়ে শুল্ক ফাঁকি রোধে কাজ করতে গিয়ে নানা ধরনের চাপ ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সহায়তার অভাবে অভিযানের কার্যকারিতা কমে যায়। বিশেষ করে পুরান ঢাকা ও ইসলামপুরকেন্দ্রিক কিছু চক্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তথ্য উঠে এলেও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা সব সময় সম্ভব হয় না।

তারপরও বন্ড কমিশনারেটগুলো বিভিন্ন অনিয়ম উদ্ঘাটনে সক্রিয় রয়েছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট ৩৫টি প্রিভেন্টিভ কার্যক্রম পরিচালনা করে প্রায় ২০৮ কোটি টাকার অনিয়ম শনাক্ত করেছে এবং ৪৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। একই সময়ে ৭৯০টি প্রতিষ্ঠানের অডিটে আরও ২০৮ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া কমিশনারেটটির ৪৪টি মামলা বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন, যেখানে সংশ্লিষ্ট রাজস্বের পরিমাণ ২৩৩ কোটি টাকারও বেশি।

একই সময়ে ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট ৩০টি প্রিভেন্টিভ অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৯২ কোটি টাকার অনিয়ম উদ্ঘাটন করেছে। এছাড়া ১ হাজার ২২টি প্রতিষ্ঠানের অডিটে ১৬৬ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি শনাক্ত করা হয়েছে এবং প্রায় ৫৩ কোটি টাকা আদায় করা সম্ভব হয়েছে।

সম্প্রতি পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কিছু পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরিয়ে নিয়ে পরে রাজধানীর পাইকারি বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটালাইজেশন বন্ড ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এটি এককভাবে সমস্যার সমাধান নয়। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির পাশাপাশি নিয়মিত অডিট, গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং মাঠপর্যায়ে কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জনবল ও লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বন্ড ব্যবস্থার অপব্যবহার কমবে, রাজস্ব সুরক্ষা জোরদার হবে এবং রপ্তানিমুখী শিল্পখাতে একটি আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ গড়ে উঠবে।

সর্বশেষ হালনাগাদ 2 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version