অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
চার বছর পর দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্য আবারও উদ্বৃত্ত হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে বাংলাদেশ ৩২৯ কোটি মার্কিন ডলারের সামগ্রিক লেনদেন উদ্বৃত্ত দেখেছে, যা অর্থনৈতিক ভারসাম্য ফিরে পাওয়ার এক উল্লেখযোগ্য সূচক বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি কমে এসেছে প্রায় ২ হাজার ৪৫ কোটি ডলারে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২০০ কোটি ডলার কম।
• ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল প্রায় ২ হাজার ২৪৩ কোটি ডলার।
• ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ছিল ২ হাজার ৭৩৮ কোটি ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, রফতানিতে উন্নতি ও আমদানি নিয়ন্ত্রণ—এই দুটি প্রধান কারণে বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে। তবে এর বিপরীতে একটি উদ্বেগজনক দিকও রয়েছে। আমদানি কমার ফলে অনেক শিল্প খাতে কাঁচামালের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে ডলার সংকট কিছুটা প্রশমিত হওয়ায় আমদানিতে এখন আর অতীতের মতো কড়াকড়ি নেই। বড়-ছোট সব ধরনের আমদানিকারকই ঘোষিত দরে ব্যাংক থেকে ডলার পাচ্ছেন। তবে অনিয়ম, ঋণ নিয়ে অর্থ পাচার এবং কাগুজে আমদানি রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কড়াকড়ি অব্যাহত রেখেছে।
সরকার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিগত সরকারের সময় অর্থ পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের বিষয়ে বর্তমানে যৌথ তদন্ত চলছে। সেই সঙ্গে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে আগে এক ধরনের এলসি খুলে অন্য ধরনের পণ্য আনার যে অনিয়ম ছিল, তা এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে।
এই সব কারণেই সামগ্রিকভাবে ডলার প্রবাহে উন্নতি এসেছে। বিশেষত রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ৩৩ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৬৪১ কোটি ডলার বা প্রায় ২৬.৮২ শতাংশ বেশি। হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেলের প্রবণতা কমে আসায় খোলাবাজার ও ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের দামের ব্যবধান কমেছে, ফলে প্রবাসীরা আনুষ্ঠানিক চ্যানেল ব্যবহার করে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত হয়েছেন।
এই রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ফলে চলতি হিসাবে ভারসাম্যে ঘাটতি নয়, বরং উদ্বৃত্ত দেখা গেছে।
• ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৯৮ কোটি ডলার।
• অথচ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এখানে ৬৫১ কোটি ডলারের ঘাটতি ছিল।
• ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই ঘাটতি ছিল ১ হাজার ১৬৩ কোটি ডলার।
এই প্রথম ২০১৫-১৬ অর্থবছরের পর আবার চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত দেখা গেল। তখন উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ২৫০ কোটি ডলার।
আর্থিক হিসাবেও এবার ইতিবাচক ফল মিলেছে:
• ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৩২০ কোটি ডলার।
• ২০২৩-২৪ সালে এই উদ্বৃত্ত ছিল ৪৫৫ কোটি ডলার।
• ২০২২-২৩ সালে তা ছিল ৬৮৯ কোটি ডলার।
সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের জুন শেষে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত হয়েছে ৩২৯ কোটি ডলার।
• ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে ঘাটতি ছিল ৪৩০ কোটি ডলার,
• আর ২০২২-২৩ সালে ঘাটতি ছিল ৮২২ কোটি ডলার।
• তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২১-২২ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৬৬৬ কোটি ডলার।
• সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে উদ্বৃত্ত দেখা গিয়েছিল—প্রায় ৯২৭ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানিয়েছে, সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে।
• ২০২৫ সালের জুন শেষে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩১.৭৭ বিলিয়ন ডলার,
যা গত ২৮ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
• সর্বশেষ ২০২৩ সালের মার্চে রিজার্ভ ৩২ বিলিয়নের নিচে নেমেছিল।
• জুন শেষে IMF-এর BPM6 পদ্ধতিতে হিসাব করলে রিজার্ভ দাঁড়ায় ২৬.৭৪ বিলিয়ন ডলার।
• ২০২৩ সালের জুনে যখন IMF এর শর্ত অনুযায়ী হিসাব শুরু হয়, তখন তা ছিল ২৪.৭৫ বিলিয়ন ডলার।
এই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবে বিনিময় হার বাজার নির্ধারণের ওপর ছেড়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা ছিল IMF-এর অন্যতম প্রধান শর্ত। এর ফলে জুলাই মাসে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে প্রতি ডলারে ৩ টাকা ৪৫ পয়সা কমে ডলার বিক্রি হয়েছে ১১৯ টাকা ৫০ পয়সায়।
উপসংহার
চার বছর পর আবারও বৈদেশিক লেনদেনে উদ্বৃত্ত এবং রিজার্ভে বৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি শক্তিশালী ইতিবাচক বার্তা। যদিও এর পেছনে আমদানি কমে যাওয়া এবং কড়াকড়ি মূলক মনিটরিং অন্যতম ভূমিকা রেখেছে, তবে রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং শুল্কনীতি শৃঙ্খলায় ফিরে আসা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/৬ আগস্ট, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 7 months আগে

